
যুগভেরী ডেস্ক ::: নানা আলোচনা-সমালোচনার মধ্যে কয়েক শ’ বছরের ইতিহাসে সোমবার প্রথমবারের হযরত শাহজালাল (রহ.) মাজারের টাকা প্রকাশ্যে গণনা করা হয়। সিলেট থেকে প্রত্যাহার হওয়া জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলম মাজারের টাকা প্রকাশ্যে গণনার এ উদ্যোগ নেন।
প্রথমবারের গণনায় মাত্র ৪ দিনে মাজারের দানবাক্সে পাওয়া যায় সাড়ে ১৭ লাখ টাকা। এছাড়া কিছু স্বর্ণ ও বিদেশি মুদ্রা পাওয়া যায়।
প্রশ্ন ওঠেছে, এই টাকা কার কাছে থাকবে? একইসঙ্গে আগে মাজারের দানবাক্স ও ডেগে জমা হওয়া টাকা কোথায় যেতো এবং মাজারে দিনে বা মাসে কী পরিমান টাকা উঠে- এসব প্রশ্নও দেখা দিয়েছে।এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করেছে সিলেটটুডে।
তবে, খাদেমসহ মাজার সংশ্লিস্টরা বলছেন, সোমবার গণনা হওয়া টাকা কোথায় রাখা হয়েছে তা তারা জানেন না। এই অর্থ ব্যবস্থাপনা বা সংরক্ষণের সাথে তাদের সম্পৃক্ত করা হয়নি।
আয়-ব্যয়ের স্বচ্ছতা আনার কথা বলে গত বৃহস্পতিবার হযরত শাহজালাল (রহ.) মাজারের দানের ৩টি ডেগে সিলগালা করে জেলা প্রশাসন। একইদিনে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাজারে দানবাক্স বসানো হয়।
তবে এ নিয়ে মাজার সংশ্লিষ্টদের মধ্যে অসন্তোষ ও ক্ষোভ দেখা দেয়। তারা মাজারে প্রশাসনিক হস্তক্ষেপের নিন্দা জানান। এ নিয়ে সমালোচনার মধ্যে সারওয়ার আলমকে রোববার জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে সিলেটের জেলা প্রশাসকের পদ থেকে প্রত্যাহার করা হয়। তাকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের উপ সচিব হিসেবে যোগ দিতে বলা হয়। তবে প্রজ্ঞাপনে প্রত্যাহারের নির্দিষ্ট কোনো কারণ উল্লেখ করা হয়নি।
এদিকে, প্রত্যাহারের আদেশের পরদিন সোমবার প্রচলিত রেওয়াজ ভেঙে প্রথমবারের শাহজালাল (রহ.) মাজারের দানবাক্সের টাকা গণনার উদ্যোগ নেন সারওয়ার আলম।
প্রকাশ্যে গণনা শেষে শাহজালাল (রহ.) মাজারে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে স্থাপন করা ৩টি ডেগ ও একটি দানবাক্স খুলে গণনায় নগদ ১৭ লাখ ৬৫ হাজার ৫৫৯ টাকা এবং ৭ আনা সোনা পাওয়া যায়।
এই টাকা কী করা হবে জানতে চাইলে সিলেটের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) সাঈদা পারভীন বলেন, ‘মাজারের টাকা সোনালী ব্যাংকে মাজারের নামীয় একটি হিসাবে রাখা হবে। সম্প্রতি এই অ্যাকাউন্ট খোলা হয়েছে। পরবর্তীতের এই টাকার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’
ব্যাংক একাউন্টের সাথে সম্পৃক্ত নয় মাজার কতৃপক্ষ
শাহজালাল (র.) মাজারের উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে গত সপ্তাহে নিজ কার্যালয়ে আয়োজিত এক সভায় বিদায়ী জেলা প্রশাসক সারওয়ার আলম জানিয়েছিলেন, মাজারে দান হওয়া টাকা মাজার কর্তৃপক্ষ ও ওয়াকফ এস্টেটের মাধ্যমে ব্যয় করা হবে। এই দুই পক্ষের মাধ্যমে পরিচালিত একটি ব্যাংক একাউন্টে এই টাকা রাখা হবে।
তবে দানের টাকা রাখার জন্য মাজারের নামে একটি ব্যাংক একাউন্ট খোলা হলেও তাতে সম্পৃক্ত করা হয়নি মাজার কতৃৃপক্ষকে।
এমনটি জানিয়ে হযরত শাহজালাল (র.) মাজারের খাদেম মুফতি রায়হান উদ্দিন মুন্না সিলেটটুডেকে বলেন, আমরা মিডিয়ার মাধ্যমে শুনেছি, শাহজালাল মাজারের নামে ব্যংকে একটা একাউন্ট খোলা হয়েছে। তবে এতে আমাদের কাউকে সম্পৃক্ত করা হয়নি। এমনকি আমাদের জানানোও হয়নি।
তিনি বলেন, কাল মাজারের দানবাক্সের টাকা গণনার বিষয়টিও আমাদের জানানো হয়নি।
মাজার ভক্তদের সংগঠন আশেকানে আউলিয়া বাংলাদেশের চেয়ারম্যান জামান চৌধুরী বলেন, শুনেছি জেলা প্রশাসক ব্যাংকে একটি একাউন্ট করেছেন। কিন্তু মাজার সশ্লিস্ট কাউকে এতে সম্পৃক্ত করা হয়নি। এই টাকা কীভাবে বা কারা ব্যয় করবে তাও আমরা জানি না।
সোমবার দানবাক্সের টাকা গণনার পর টাকার পরিমাণ ঘোষণা করেন সিলেটের ওয়াকফ অডিটর মো. সজল মিয়া। এ ব্যাপারে তার বক্তব্য জানা যায়নি।
তবে জেলা প্রশাসকের দায়িত্বে থাকাকালে সারওয়ার আলম জানিয়েছিলেন, মাজারের টাকা সরকার নিবে না। এই টাকা মাজারেই ব্যয় করা হবে।
তিনি বলেন, জেলা প্রশাসক ও ওয়াকফ ইন্সপেক্টরের যৌথ একাউন্টে এই টাকা রাখা হবে।
আগে দানবাক্সের টাকা কী করা হতো
প্রকাশ্যে গণনায় মাত্র চারদিনে সাড়ে ১৭ লাখ টাকা পাওয়ার পর মাজারের দানবাক্সে মাসে কী পরিমাণ টাকা জমা হয় তার একটা ধারণা করতে শুরু করেছেন অনেকে।
আগে মাজার কর্তৃপক্ষের ডেগ ও দানবাক্সেই জমা হতো এই টাকা। যা খাদেমরাই তদারকি করতেন। প্রশ্ন ওঠেছে এই টাকা কীভাবে ব্যয় হতো? কোথায় যেতো এসব টাকা?
এ ব্যাপারে হযরত শাহজালাল (র.) মাজারের খাদেম মুফতি রায়হান উদ্দিন মুন্না সিলেটটুডেকে বলেন, শাহজালাল (র.) বিয়ে করেননি। তবে তার ভাগনে বিয়ে করেছিলেন। শাহজালাল (র.) জীবিত থাকতেই তার মাজারের উত্তোলিত টাকার কিছু অংশ তার ভাগনের সংসারের খরচের জন্য প্রদানের ব্যবস্থা করেন। সেই ধারাবাহিকতা এখনও রয়েছে। এখন সেই ভাগনের উত্তরসূরী প্রায় ৩০০ পরিবার আছে সিলেটে। যারা সরওকুম, মুফতি ও সৈয়দ পরিবার নামে পরিচিত।
তিনি বলেন, এই তিনশ’ পরিবার থেকে প্রতিদিন একেকজন মাজারের তদারকি ও ব্যবস্থাপার দায়িত্ব পালন করেন। যা ‘বাড়ি প্রথা’ নামে পরিচিত। যিনি যেদিন দায়িত্ব পলন করেন তিনি মাজারের রক্ষণাবেক্ষন খরচ, কর্মীদের বেতন, লঙ্গরখানার থাকা-খাওয়ার খরচ ব্যয় করে যা উদৃত থাকে তা নিয়ে যান। মাজারের ব্যস্থাপনার দায়িত্ব পালনের হাদিয়া হিসেবেই তিনি এই টাকা নেন। আবার সদকা হিসেবে কেউ কিছু প্রদান করলে তা উপযুক্ত ব্যক্তির মধ্যে বিতরণ করা হয়।
মুফতি রায়হান উদ্দিন মুন্না বলেন, আমরা কখনোই মাজারে দান করার জন্য প্রচার চালাই না। কাউকে বলিও না। এমনকি মাজারের ওরসেরও কোন প্রচার চালানো হয় না। লোকজন নিজের ভক্তি ও ভালোবাসা থেকেই এখানে আসেন, দান করেন।
দিনে কত টাকা উঠে মাজারে
শাহজালাল (র.) মাজারে দিনে কত টাকা উঠে এই নিয়েও আলোচনা চলছে। তবে এ ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট কোন হিসেব পাওয়া যায়নি।
মাজার ভক্তদের সংগঠন আশেকানে আউলিয়া বাংলাদেশের চেয়ারম্যান জামান চৌধুরী সিলেটটটুডেকে বলেন, মাজারে কত টাকা উঠে তার নির্দিষ্ট করে বলা সম্ভব নয়। কোন কোন দিন ২০/২৫ হাজার, কোনদিন ৫০ হাজার আবার বৃহস্পতিবার বা এরকম যেসব দিনে ভক্ত সমাগম বেশি হয়, সেসব দিনে এক থেকে দেড় লাখ টাকাও উঠে।
যদিও সোমবার জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে গণনায় দেখা যায়, ৪ দিনেই সাড়ে ১৭ লাখ টাকা জমা পড়েছে।
তবে নাগরিক সংগঠক আব্দুল করিম কীম সিলেটটুডেকে বলেন, মাজারে টাকা প্রদানের রেওয়াজ খুব বেশি দিনের পুরনো হয়। আগে মানুষজন গাছের ফল বা সবজি, গৃহপালিত কোন পশু বা প্রাণি এসব নিয়ে আসতো। এছাড়া আগে তো থাকার জন্য মাজারের পাশে কোন হোটেল ছিলো না। পর্যটক বা ভক্ত যারাই আসতেন তাদের সবার থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা মাজার কর্তৃপক্ষকেই করতে হতো। পর্যটক ইবনে বতুতা থেকে কবি জসিম উদ্দিন- এরকম অনেকেরই থাকার ব্যবস্থাও মাজার কর্তৃপক্ষকে করতে হয়েছে। ফলে তখন দেখা যেতো আয়ের চেয়ে ব্যয়ই হয়তো বেশি হতো।
তার মতে, জেলা প্রশাসনের সাম্প্রতিক উদ্যোগ মাজার অনুসারী ও কওমী ঘরানার মধ্যে বিভেদ তৈরি করেছে। এই দুই অনুসারীকে মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেওয়া হয়েছে।
সংবাদটি ভালো লাগলে স্যোশাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন