
যুগভেরী ডেস্ক ::: ২০২৫ সালের আগস্ট মাস। সিলেটের পর্যটন কেন্দ্র সাদাপাথরের পাথর লুট-কাণ্ডে দেশজুড়েই চলছে ব্যাপক সমালোচনা। লুট ঠেকাতে প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। এমন অবস্থায় ওই বছরের ২১ আগস্ট তৎকালীন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ শের মাহবুব মুরাদকে সরিয়ে মো. সারওয়ার আলমকে সিলেটের দায়িত্বে আনা হয়।
তবে মাত্র ১০ মাসের মাথায়ই প্রত্যাহার করে নেওয়া হলো সারওয়ার আলমকে। সিলেটের শাহজালাল (রহ.) মাজারের আয় ব্যয়ের স্বচ্ছতা আনার নামে দানের ডেগ সিলগালা করা নিয়ে আলোচনার মধ্যেই সারওয়ার আলমকে সরিয়ে নেওয়া হলো।
প্রশ্ন ওঠেছে কেন সারওয়ার আলমে এই তাৎক্ষণিক প্রত্যাহার? এটি প্রশাসনের কর্মকর্তাদের নিয়মিত বদলির অংশ নাকি শাস্তিমূলক ব্যবস্থা।
রোববার এক প্রজ্ঞাপনে সারওয়ার আলমকে ‘জনস্বার্থে’ প্রত্যাহার করার কথা জানায় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের উন-২ শাখা থেকে জারি করা প্রজ্ঞাপনে তাকে সিলেট থেকে প্রত্যাহার করে মন্ত্রণালয়ের উপসচিব হিসেবে সংযুক্ত করা হয়। রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে প্রজ্ঞাপনে সই করেছেন সিনিয়র সহকারী সচিব জেতী প্রু।
প্রত্যাহারের বিষয়টি নিশ্চিত করে বিদায়ী জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলম নিজে জানান, আগামীকাল সোমবারই তাকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে যোগ দিতে বলা হয়েছে।
মো. সারওয়ার আলম সাবেক জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ শের মাহবুব মুরাদের স্থলাভিষিক্ত হয়েছিলেন, কিন্তু সারওয়ার আলমের প্রত্যাহারাদেশে নতুন জেলা প্রশাসক নিয়োগ দেয়নি সরকার। ২৪ ঘণ্টার নোটিসে তাৎক্ষণিক ঢাকা যোগ দেওয়ার এই নির্দেশ নিয়েও আলোচনা চলছে।
এক সময়ের র্যাবের আলোচিত ম্যাজিস্ট্রেট সারওয়ার আলম সিলেটে জেলা প্রশাসক হিসেবে যোগদানের পর বেশ আলোচিত হন। শুরুর দিকে তার কিছু উদ্যোগ প্রশংসা পায়। বিশেষত সিলেটের ফুটপাত থেকে হকারদের অপসারণ, ট্রেনের টিকটি কালোবাজারি বন্ধ, ওসমানী হাসপাতাল দালালমুক্তকরণ ইত্যাদি।
তবে এসব উদ্যোগ বেশিদিন স্থায়িত্ব পায়নি। কিছুদিন পরই পূর্বের অবস্থায় ফিরে যায় সব। এছাড়া আরও নানা বিষয়ে আশ্বাস দিয়েও বাস্তবায়ন করতে পারেননি তিনি।
বিশেষত গত বছরের সিলেট-ঢাকা মহাসড়কের জমি অধিগ্রহণে ধীরগতি, নগরের ভূমিকম্প ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত সব ভবন ভেঙে ফেলার আশ্বাস দিয়েও এ ব্যাপারে উদ্যোগহীনতাসহ নানা কারণে সমালোচনার মুখেও পড়তে হয় সারওয়ার আলমকে।
যে সাদাপাথর লুট কাণ্ডে তাকে সিলেটের দায়িত্বে আনা হয়, সেই ঘটনার তদন্ত রিপোর্টও আজ পর্যন্ত প্রকাশ করতে পারেননি। নানা তোড়জোড় সত্ত্বেও নগরের ফুটপাত থেকে হকার সরানো যায়নি। কিনব্রিজও ফের হকারদের দখলে চলে যাচ্ছে।
সবশেষ সমালোচনায় পড়েন সিলেটের হযরত শাহজালাল (র.) মাজার এর দানের ডেগ সিলগালা করে।
গত ১২ জুন মাজার পরিদর্শনে গিয়ে দানবাক্সে তালা লাগানোর নির্দেশ দেন তৎকালীন জেলা প্রশাসক সারওয়ার আলম। এরপর ১৮ জুন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মাসুদ রানার উপস্থিতিতে মাজার প্রাঙ্গণে প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে নতুন দানবাক্স স্থাপন করা হয় এবং দানের ব্যবহৃত পুরনো তিনটি ঐতিহাসিক ডেগ সিলগালা করা হয়। নিরাপত্তার জন্য মোতায়েন করা হয় আনসার সদস্যও। শনিবার দানবাক্সের পাহারায় সিসি ক্যামেরাও বসানো হয়।
এতে ক্ষোভ প্রকাশ করেন মাজার সংশ্লিষ্টরা। যদিও জেলা প্রশাসকের দাবি, মাজারের আয়-ব্যয়ে স্বচ্ছতা আনতে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
মাজার নিয়ে ডিসির এই কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদে রোববারই (২১ জুন) দেশ-বিদেশে বসবাসকারী সিলেটের ৬৭ জন বিশিষ্ট নাগরিক তীব্র ক্ষোভ ও উদ্বেগ জানিয়ে যৌথ বিবৃতি প্রকাশ করেন। এছাড়াও সামাজিক মাধ্যমে এনিয়ে চলছে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা।
মাজারের খাদিম মুফতি রায়হান উদ্দিন মুন্নার মতে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর যারা বিভিন্ন স্থানে মাজার ভাঙচুর করেছিলো, সেই অপশক্তির ইন্ধনেই শাহজালাল (র.) মাজারের আয় ব্যয়ের স্বচ্ছতা আনার নামে প্রশাসনিক খবরদারি শুরু হয়েছে।
তিনি বলেন, এটা খুবই অন্যায় হচ্ছে। এটা মাজার ও অলি-আউলিয়া বিরোধী কর্মকাণ্ড। দানের টাকা কেবল খাদেমরা নেন না, মসজিদসহ মাজারের উন্নয়নেও ব্যয় করেন। হিসাব চাইতেই পারেন কেউ। কিন্তু জোর-জবরদস্তি করে যেভাবে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা চলছে, সেটা ঠিক নয়।
যদিও এ উদ্যোগের ব্যাপারে জেলা প্রশাসক সারওয়ার আলম তখন বলেছিলেন, দীর্ঘদিন ধরে মাজারে দানের টাকা ভাগ-বাঁটোয়ারা করে নেওয়ার একটা অনিয়মতান্ত্রিক পরম্পরা চালু হয়েছে। এখানে দানের যে টাকা আসে, সেটা পাবলিক সম্পত্তি। স্থানীয় প্রশাসন দানের টাকার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির আওতায় আনতেই উদ্যোগী হয়েছে।
জেলা প্রশাসক আরও বলেন, দানের কোনো টাকা সরকার নেবে না। যাবতীয় অনিয়ম দূর করে সব টাকাই মাজার এবং মাজারের মসজিদ, মাদ্রাসার উন্নয়নে ব্যয় হবে। এ ছাড়া মাজার, মসজিদ ও মাদ্রাসার উন্নয়নে একটা মহাপরিকল্পনাও নেওয়া হচ্ছে। এ জন্য একজন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসককে আহ্বায়ক করে খাদেম, মসজিদ ও মাদ্রাসা প্রতিনিধিসহ ১০ সদস্যের একটি কমিটিও গঠন করে দেওয়া হয়েছে।
নতুন ডিসি নিয়োগ ছাড়াই তাৎক্ষণিক প্রত্যাহার
মাঠ প্রশাসনের নিয়ম অনুযায়ী, কোনো জেলার ডিসিকে নিয়মিত বা রুটিন বদলি করা হলে একই আদেশে কিংবা একই দিনে নতুন কর্মকর্তার নাম (স্থলাভিষিক্ত) ঘোষণা করা হয়, যাতে জেলার শীর্ষ প্রশাসনে কোনো শূন্যতা তৈরি না হয়। কিন্তু মো. সারওয়ার আলমের ক্ষেত্রে জারিকৃত প্রজ্ঞাপনে নতুন কোনো ডিসি নিয়োগ দেওয়া হয়নি। নতুন কর্মকর্তা বাছাই না করেই সারওয়ার আলমকে প্রত্যাহার করা নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
সংবাদটি ভালো লাগলে স্যোশাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন