
রাসেল আহমদ, মধ্যনগর :: জৈষ্ঠ্যের শেষ সময়ে প্রকৃতি জানান দিচ্ছে বর্ষার আগমনী বার্তা।গত কয়েকদিনের টানা ভারী বৃষ্টিপাতে ভারতের মেঘালয়ের পর্বতমালার গা বেয়ে নেমে আসা জলে এখন কানায় কানায় পূর্ণ দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় হাওর এলাকার নদ-নদী, হাওর-বাওরসহ সকল জলাধার। মেঘালয় পর্বতমালার পাদদেশে অবস্থিত মিষ্টি জলের জলাভূমি টাঙ্গুয়ার হাওরও এখন আয়নার মতো স্বচ্ছ পানিতে টুইটুম্বুর।
সুনামগঞ্জের তাহিরপুর ও মধ্যনগর উপজেলার প্রায় ১০০ বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে বিস্তৃত টাঙ্গুয়ার হাওর রূপ-সৌন্দর্য্য ও জীব-প্রাণবৈচিত্র্যে দেশের গন্ডী পেরিয়ে আন্তর্জাতিক পরিসরেও অনন্য। তাই ইউনেস্কো টাঙ্গুয়ার হাওরকে দিয়েছে ‘বিশ্ব ঐতিহ্য’র স্বীকৃতি।
বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে দুনিয়ার সকল জলাভূমির বিপন্নতা মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক রামসার সম্মেলন ১৯৯৯ সালে টাঙ্গুয়ার হাওরকে ‘রামসার সাইট’ ঘোষনা করে। বাংলাদেশে সুন্দরবনের পরেই এটি দ্বিতীয় রামসার সাইট।
মেঘালয় পর্বতমালার ত্রিশটি স্বচ্ছজলধারা বা ঝর্ণাধারা এসে মিশেছে টাঙ্গুয়ার হাওরে। তাই ঋতুর সাথে পাল্লা দিয়ে আগেই বর্ষার অপরুপ সাজে সেজেছে এ হাওর রানী। বিকেলের সোনারোদে মেঘের ছায়া পড়ে নীল হয়ে ওঠে বিশাল-বিস্তৃর্ণ টাঙ্গুয়ার জলরাশি। সেই জলে মৃদুমন্দ ঢেউয়ের খেলা, জলের ওপর মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা সারি সারি সবুজ হিজল ও করচগাছ এবং পাখির ওড়াউড়ি পর্যটকের মন ভরিয়ে দেয়। তখন পুরো এলাকাকে ছবির মতো মনে হয়।
এবার টাঙ্গুয়া দেখতে ঈদের ছুটিতে আসছেন হাজারো পর্যটক। লম্বা ছুটি শুরু হবার আগেই শত শত ভ্রমণ পিপাসু বুকিং করে রেখেছিলেন পর্যটকবাহী নৌযান।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, টাঙ্গুয়ার হাওরের বিলাসবহুল ৯০ টি বোট ও দেশীয় বোট বা কান্ট্রি বোটসহ প্রায় চার শতাধিক পর্যটকবাহী নৌযান রয়েছে। এসব বোটের বেশীরভাগ গুলোও ইতিপূর্বেই বুকিং দিয়েছেন আগ্রহী ভ্রমন বিলাসী পর্যটক। পর্যটকদের বরণ করতে গত কয়েক সপ্তাহ ধরে বোটের পরিচালনায় থাকা সকলেই ব্যস্ত সময় পার করছেন।
এই মৌসুমে অর্থাৎ বর্ষার শুরুতে অপেক্ষাকৃত স্বাচ্ছন্দ্যে টাঙ্গুয়ার হাওরে ভ্রমণ করা সম্ভব। এজন্য কোরবানির ঈদের এই ছুটিতে অনেক ভিড় হবে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম এই জলরাশিতে। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে দইটি পথে টাঙ্গুয়ার হাওরে পর্যটকরা প্রবেশ করতে পারেন। একটি হলো দেশের যেকোনো এলাকা থেকে প্রথমে সুনামগঞ্জ জেলা শহরে এসে, সাহেববাড়ী ঘাট, বৈঠাখালী ঘাট ও ওয়েজখালী ঘাট থেকেই অনেকে বোটে সুরমা নদীর দুইপাড় ও করচার হাওরসহ পথের ছোট বড় হাওরের মনোরম দৃশ্য দেখতে দেখতে পৌঁছে যাবেন টাঙ্গুয়ায়। আবার কেউ কেউ সুনামগঞ্জ জেলা শহরের পাশের আব্দুজ জহুর সেতু পাড় হয়ে তাহিরপুরের আনোয়ারপুর ব্রীজের পাশের ঘাট থেকে বা তাহিরপুর থানার সামনের ঘাট থেকে টাঙ্গুয়ার উদ্দেশ্যে বোটে ওঠবেন।
আরেকটি পথ হলো, রাজধানী ঢাকা থেকে আন্তঃনগর ট্রেনে নেত্রকোনা জেলার মোহনগঞ্জ নেমে সিএনজি বা বাইক রাইডিং করে মধ্যনগর নৌকাঘাট থেকে পর্যটকবাহী দেশীয় বোটে চোখের পলকেই টাঙ্গুয়ার হাওরে পৌঁছাতে পারেন। আবার ঢাকা থেকে এসি, নন-এসি বাসে নেত্রকোনা এসে বাস,মাইক্রোবাস,সিএনজিতে কলমাকান্দা উপজেলার বিশরপাশা বাজারের নৌকাঘাট থেকে বংশীকুন্ডা হয়ে টাঙ্গুয়ার হাওরে পৌছাতে পারেন অন্য যে কোনো পথের চেয়ে অনেক কম সময়ে।
বিলাসবহুল হাউজবোটগুলো এখন হাওর ভ্রমণকে আরামদায়ক করে দিয়েছে।পর্যটকদের হাওর ভ্রমনে নতুনমাত্রা এনে দিয়েছে হাউজবোট। দৃষ্টিনন্দন আধুনিক শহুরে সব সুবিধা থাকায় সকল বয়সি পর্যটকের কাছে হাওরে ভ্রমণসঙ্গী হিসেবে চাহিদার শীর্ষে এসব হাউজবোট। বিশাল আকারের নান্দনিক ডিজাইনের এসব হাউজবোটের ওপর খোলা ছাদে বসে হাওরের সৌন্দর্য উপভোগ যেমন করা যায়, তেমনি নিচে একেবারে আধুনিক বেডরুম, হাই কমোড, বাথরুম সব মিলিয়ে যেন ভাসমান তারকা হোটেল। রয়েছে চাহিদামতো দেশী খাবারের বাহারি ব্যবস্থা।
হাউসবোট ও দেশীয় বোট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দীর্ঘ প্রায় দশদিনের ছুটি, এসময় বিপুল সংখ্যক পর্যটক টাঙ্গুয়ার হাওরের আসবেন, এমন চিন্তা থেকে বোটগুলো নতুন রং, নতুন পর্দা, নয়া বিছানাচাদরসহ নানা কাজ ইতিমধ্যে সম্পন্ন করা হয়েছে। হাউসবোট ও দেশীয় বোট মালিকদের আশাও এবার পূর্ণতা পেয়েছে। আগামীকাল (৯ জুন) থেকে ১৪ জুন পর্যন্ত এই ছয়দিন প্রায় সকল বোটই অগ্রিম ভাড়া হয়েছে। কিছু পর্যটক আজ( ৮জুন) থেকেই তাদের বুকিং দেওয়া বোটে করে ভাসতে শুরু করেছেন টাঙ্গুয়ার নীল জলে। আগামীকাল নাগাদ সবক’টি পর্যটকবাহী হাউসবোট ও দেশীয় বোট হাওরে প্রবেশ করবে।
জানা গেছে, বিলাসবহুল হাউসবোটের দুই দিনের প্যাকেজ এবার বিক্রয় হয়েছে জনপ্রতি চার থেকে ১২ হাজার টাকায়। দুইদিনের প্যাকেজে পাঁচ বেলা ভাত, চার-পাঁচ বার নাস্তা, চা-কফি, পানি থাকছে ফ্রি। এছাড়া নিলাদ্রী, শিমুল বাগান, বারেকের টিলা, যাদুকাটা, টাঙ্গুয়া ওয়াচ টাওয়ার, লাকমাছড়া দেখানো এই প্যাকেজের মধ্যেই থাকছে।
খাবারের মেন্যুতে ভাতের সঙ্গে হাওরের মাছ, হাঁসের মাংস, কুয়েল পাখির মাংস, খাসির মাংস, ভর্তা, বাজি ও সবজী রয়েছে বলে জানিয়েছেন হাউসবোট সংশ্লিষ্টরা। একটি হাউসবোটে ১৫ থেকে ২৫ জন আয়েশ করে থাকতে পারেন। পারিবারিক ক্যাবিনসহ এটাচড বাথরুমও আছে কোন কোন হাউসবোটে। এয়ারকন্ডিশনের ব্যবস্থাসহ বোটে জনপ্রতি প্রতি নয় থেকে ১২ হাজার টাকার প্যাকেজও আছে।
সুনামগঞ্জ হাউসবোট ওউনার্স এসোসিয়েশনের সভাপতি আরাফাত আকন্দ বললেন, আমাদের ৯০ টি হাউসবোটের প্রায় সবকয়টি আগামীকাল(সোমবার) থেকে পর্যটকদের নিয়ে টাঙ্গুয়ার হাওরে প্রবেশ করবে। এবার সকল বোটেরই অন্যান্য প্রস্তুতির পাশপাশি অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা, পর্যটকদের জন্য লাইফ জাকেট ও নিরাপত্তার ব্যবস্থা সন্তোষজনক করেই বোট ঘুরবে টাঙ্গুয়ার হাওরে। সমিতির পক্ষ থেকে কঠোর মনিটরিং থাকছে। পরিবেশ দূষনের বিষয়টিও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। প্রশাসনেরও সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে।
দেশী বোটে ১৫ থেকে ২০ জন পর্যটক ভালোভাবে রাত্রী কাটাতে পারবেন। এসব বোট খাওয়া ও রাত্রীযাপনসহ ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকায় দুইদিনের বুকিং নিয়েছে। তারাও নিলাদ্রী, শিমুলবাগান, বারেকের টিলা, যাদুকাটা, ওয়াচ টাওয়ার, লাকমাছড়া এই খরচের মধ্যেই ঘুরিয়ে দেখাবে।
তাহিরপুর ও মধ্যনগর থানা পুলিশ সূত্র জানিয়েছে, ঈদের ছুটিতে টাঙ্গুয়ায় পর্যটকের ভিড় হবে চিন্তা করেই পুলিশকে আলাদাভাবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এ সময়ে নৌ-পুলিশ এবং ট্যুরিস্ট পুলিশ কাজ করবে হাওরে। তাহিরপুরের আনোয়াপুর ঘাট ও থানা ঘাটে পুলিশ মোতায়েন থাকবে। টহলেও থাকবে পুলিশ।মধ্যনগরের ঘাটগুলোতে পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগের মোবাইল নম্বরগুলো টাঙিয়ে দেওয়া হবে।
এদিকে টাঙ্গুয়ার হাওরে পর্যটকদের জন্য পর্যটন নীতিমালা না থাকায় গত কয়েক বছরধরে হাওরটি পর্যটকদের নানাবিদ স্বেচ্ছাচারের শিকার হয়ে পরিবেশ ও জীব-প্রাণবৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে আসছে। এ বিষয়ে সম্প্রতি অনেকেই কথা বলছেন। তাদেরই একজন স্থানীয় হাওর গবেষক,লেখক ও সংস্কৃতিকর্মী সজল কান্তি সরকার। তিনি তাঁর ফেসবুকে টাঙ্গুয়ার হাওরে আসা পর্যটকদের প্রতি লিখেছেন, “ঈদের ছুটিতে যারা হাওরে ভ্রমণ করবেন তাদের প্রতি বিনীত অনুরোধ- ব্যবহৃত প্লাস্টিক, প্লাস্টিকজাত বোতল বা পলিথিন হাওরের পানিতে ফেলবেন না। হাওরের পানিতে অর্ধ ডুবন্ত হিজল খরচবাগ থেকে দূরে থাকুন। কেননা এখন হিজল ফুল ফোটার মৌসুম চলছে। তাই পরাগায়ণ বাধাগ্রস্ত হলে বীজ হবে না। ভ্রমণ করতে গিয়ে যারা(যদি) মদ সেবন করেন। তারা গোপনীয়তা রক্ষায় দয়া করে নিরাপদ হতে কাঁচের বোতল হাওরের পানিতে ফেলবেন না। মনে রাখবেন কৃষি মৌসুমে এই কাঁচের বোতল কৃষকের প্রাণনাশের কারণ হতে পারে। রাতে ভ্রমণ থেকে বিরত থাকুন। কারণ হাওরের প্রাণবৈচিত্রও রাতের নীরবতা চায়। তাই শব্দদূষণ পরিহার করুন। ইঞ্জিন চালিত নৌকা চলাচলে সচেতন হোন। নৌকা চলাচলে ব্যবহৃত কেরোসিন বা অন্যকোন দাহ্য পদার্থ যেন হাওরের মিঠাপানিতে মিশে না যায় সেদিকে খেয়াল রাখুন। বিশেষ করে হাওরে এখন পোনা মাছ বৃদ্ধির উপযুক্ত সময়। কেরোসিন যেমনি মিঠাপানির গুনাগুন নষ্ট করে তেমনি পোনা ও ছোট মাছের সহজে প্রাণনাশ করে। নৌকা চলাচলে ইঞ্জিনের শব্দ ও তার পাখার ঘূর্ণন মাছের স্বাভাবিক চলাফেরা ব্যাহত করে। তাছাড়া জলজ উদ্ভিদেরও ভীষণ ক্ষতি করে। তাই নৌকা চলাচলে সুনির্দিষ্ট জলপথ ব্যবহার করুন। সর্বোপরি আপনার আনন্দ ভ্রমণ যেন পরিবেশ বান্ধব ও শৈল্পিক হয় সেদিকে খেয়াল রাখুন।”
তিনি বলেন, “জৈষ্ঠ্য-আষাঢ় এই দুই মাস হাওরে ভ্রমণ না করাই ভালো। কেননা তখন হাওরে মাছ, কৃষিপ্রাণ ও জীববৈচিত্র্য গড়ে ওঠার উপযুক্ত সময়। তাই চলুন অন্তত জৈষ্ঠ্য-আষাঢ় এই দুই মাস হাওর ভ্রমণে সতর্ক হই।”
টাঙ্গুয়ার হাওরে পর্যটন বিষয় নিয়ে সুনামগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক রেজাউল করিম বললেন, ‘টাঙ্গুয়ায় ভ্রমণ নীতিমালা মেনে সকল বোটকে নিয়ে ঢুকতে বলা হয়েছে। তিনি জানান, বর্ষা মৌসুমের শুরু এখন। টাঙ্গুয়ায় ভ্রমণ পিপাসুদের যেতে কোন সমস্যা এখনো হয় নি। তবে বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হলে বা হাওরে বিপদ হতে পারে এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে পর্যটকবাহী বোট যেতে নিরুৎসাহিত করা হবে।’
সংবাদটি ভালো লাগলে স্যোশাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন