
রেজওয়ান আহমদ ::: গ্রামের অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও সামাজিক উন্নয়নের জন্য নানা উদ্যোগ নিয়ে মানুষ মানুষের জন্য—এই মানবিক দর্শনকে সামনে রেখে দীর্ঘদিন ধরে অসহায় ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের কল্যাণে কাজ করে যাচ্ছে ওয়াদুদ-ময়মুন্নেসা ফাউন্ডেশন। মৌলভীবাজার জেলার বড়লেখা উপজেলার পাকশাইল গ্রামে প্রতিষ্ঠিত এ ফাউন্ডেশন স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, মানবকল্যাণ ও সামাজিক উন্নয়নমূলক বিভিন্ন কার্যক্রমের মাধ্যমে স্থানীয় মানুষের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনার চেষ্টা করছে। বিশেষ করে অর্থের অভাবে চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন পরিচালিত কমিউনিটি হাসপাতালটি হয়ে উঠেছে আশার একটি জায়গা।
এই কমিউনিটি হাসপাতালটির কার্যক্রম প্রশংসনীয়, প্রত্যন্ত পাকশাইল গ্রামের মানুষের জন্য চিকিৎসার জন্য একমাত্র ভরসা হচ্ছে এই হাসপাতালটি, অসুস্থ রোগীরা গ্রামের মধ্যেই হাসপাতালটি থাকায় দ্রুত চিকিৎসা সেবা নিতে পারছে, শহর থেকে এই গ্রামের দূরত্ব পায় বিশ কিলোমিটার, যার কারনে একজন মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়লে শহরে নিয়ে চিকিৎসা সেবা দিতে হলে ভোগান্তির মধ্যে পড়তে হয়। এই হাসপাতালটি কাছে হওয়ায় সহজেই প্রাথমিক চিকিৎসা গুলো নিতে পারেন গ্রামের সাধারণ মানুষ। গ্রামের মধ্যে এমন একটি হাসপাতাল হওয়ায় গ্রামের মানুষও খুশি। এক সময় গ্রামের মধ্যে হাসপাতাল না থাকায় সময় মত চিকিৎসা না দেওয়ার কারণে অনেক রোগী মারা যেত। গ্রামের মানুষ যাতে সহজে চিকিৎসা সেবা পায় সেই কথা চিন্তা করে গ্রামের মধ্যে একটি হাসপাতাল বানানোর উদ্যোগ নেন গ্রামের কৃতি সন্তান ডাক্তার নুরুন্নাহার ফাতেমা।
২০০৭ সালে স্বাধীনতা পদকপ্রাপ্ত প্রখ্যাত শিশু হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. নুরুন্নাহার ফাতেমা বেগম তাঁর বাবা-মায়ের স্মৃতিকে ধারণ করে ওয়াদুদ-ময়মুন্নেসা ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা করেন। প্রতিষ্ঠার শুরু থেকেই মানুষের কল্যাণকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে প্রতিষ্ঠানটি বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক কর্মসূচি পরিচালনা করে আসছে। সময়ের সঙ্গে ফাউন্ডেশনের কার্যক্রমের পরিধিও বিস্তৃত হয়েছে। প্রত্যন্ত এলাকার নিম্নআয়ের মানুষ যাতে প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত না হন, সে লক্ষ্যেই বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে স্বাস্থ্যখাতকে।
ফাউন্ডেশন পরিচালিত কমিউনিটি হাসপাতালের মাধ্যমে গ্রামের অসহায় ও দরিদ্র রোগীদের চিকিৎসাসেবা প্রদান করা হচ্ছে। সাশ্রয়ী চিকিৎসাসেবার পাশাপাশি নিয়মিত আয়োজন করা হয় বিভিন্ন বিনামূল্যের চিকিৎসা কার্যক্রম। এর মধ্যে রয়েছে ফ্রি ফ্রাইডে ক্লিনিক, বিনামূল্যের খতনা ক্যাম্প, হার্ট স্ক্রিনিং ক্যাম্প, চক্ষু ক্যাম্প এবং বিনামূল্যে ওষুধ বিতরণ। চক্ষু ক্যাম্পের মাধ্যমে দরিদ্র রোগীদের ছানি অপসারণের ব্যবস্থা করা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী চশমা প্রদান করা হচ্ছে। এসব উদ্যোগের ফলে প্রত্যন্ত অঞ্চলের অনেক মানুষ নিজ এলাকায় থেকেই প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা পাওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন।
শুধু চিকিৎসা প্রদান নয়, রোগ প্রতিরোধ ও স্বাস্থ্যসচেতনতা বৃদ্ধিতেও কাজ করছে ফাউন্ডেশনটি। সাধারণ মানুষের মধ্যে জরুরি চিকিৎসা বিষয়ে সচেতনতা তৈরির লক্ষ্যে সিপিআর (CPR) ও বেসিক লাইফ সাপোর্ট (BLS) প্রশিক্ষণের আয়োজন করা হচ্ছে। আকস্মিক অসুস্থতা বা জরুরি পরিস্থিতিতে প্রাথমিকভাবে কীভাবে একজন মানুষকে সহায়তা করা যায়, সে বিষয়ে প্রশিক্ষণ প্রদানের মাধ্যমে স্থানীয় পর্যায়ে সক্ষমতা তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
স্বাস্থ্যসেবার পাশাপাশি শিক্ষা ও সামাজিক উন্নয়নেও রয়েছে ফাউন্ডেশনের নানা কার্যক্রম। দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত শিক্ষার্থীদের মধ্যে শিক্ষা উপকরণ বিতরণ, অসহায় রোগীদের চিকিৎসা সহায়তা, শীতার্ত মানুষের মধ্যে শীতবস্ত্র বিতরণ এবং বিভিন্ন দুর্যোগের সময় ত্রাণ ও খাদ্য সহায়তা প্রদান করা হয়। প্রয়োজনের সময়ে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মাধ্যমে মানবিক সহায়তার পরিধি আরও বিস্তৃত করার চেষ্টা করছে প্রতিষ্ঠানটি।
ফাউন্ডেশনের এসব উদ্যোগের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো—মানুষের প্রয়োজনকে গুরুত্ব দিয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করা। চিকিৎসার পাশাপাশি সচেতনতা, শিক্ষা ও সামাজিক সহায়তাকে গুরুত্ব দেওয়ায় এর কার্যক্রম একটি সমন্বিত জনকল্যাণমূলক উদ্যোগে পরিণত হয়েছে। স্থানীয়ভাবে অনেক পরিবার চিকিৎসা ও অন্যান্য সহায়তার ক্ষেত্রে ফাউন্ডেশনের বিভিন্ন কর্মসূচি থেকে উপকৃত হচ্ছে।
পাকশাইলসহ আশপাশের এলাকার মানুষের কাছে ওয়াদুদ-ময়মুন্নেসা ফাউন্ডেশন এখন একটি মানবিক প্রতিষ্ঠানের নাম। মানুষের বিপদে পাশে দাঁড়ানো, অসহায় রোগীদের চিকিৎসাসেবা দেওয়া এবং সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জন্য বিভিন্ন সহায়তা নিশ্চিত করার মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠানটি স্থানীয় পর্যায়ে আস্থা তৈরি করেছে। বিশেষ করে প্রত্যন্ত অঞ্চলে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে কমিউনিটি হাসপাতালটির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, মানুষের কল্যাণে পরিচালিত এসব কার্যক্রম ভবিষ্যতেও ধারাবাহিকভাবে অব্যাহত থাকবে। পাশাপাশি প্রয়োজন ও সক্ষমতা অনুযায়ী স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা এবং সামাজিক উন্নয়নমূলক কার্যক্রম আরও সম্প্রসারণের পরিকল্পনাও রয়েছে। মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে মানবিক সমাজ গঠনে অবদান রাখাই ওয়াদুদ-ময়মুন্নেসা ফাউন্ডেশনের মূল লক্ষ্য। সেই লক্ষ্যকে সামনে রেখে প্রতিষ্ঠানটির পথচলা আগামী দিনেও অব্যাহত থাকবে—এমন প্রত্যাশা স্থানীয় মানুষের।
ফাউন্ডেশন পরিচালনায় রয়েছেন চেয়ারম্যান এ কে এম ফারুক, সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান ফৌজিয়া মাহমুদ, নির্বাহী চেয়ারম্যান এ কে এম রাজ্জাক, কোষাধ্যক্ষ এডভোকেট এ কে এম বদরুদ্দোজা, সেক্রেটারি জেনারেল ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ডা. নুরুন্নাহার ফাতেমা বেগম, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল শামসুন্নাহার ফাহমিদা, অফিস সেক্রেটারি
রুবিনা আফরোজ মুনা, প্রজেক্ট সেক্রেটারি মাহমুদা ফারহীন। এছাড়াও পরিবারের সদস্যরা স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে রয়েছেন।
সংবাদটি ভালো লাগলে স্যোশাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন