
ড. আবদুল আলীম তালুকদার :: ইসলামি জীবনদর্শনের পঞ্চস্তম্ভের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে রোজা। মৌলিক ইবাদতগুলোর মধ্যে সালাত ও জাকাতের পরই রোজার স্থান। ইসলামি বিশেষজ্ঞদের কারও কারও মতে সালাতের পরই রোজার গুরুত্ব। কেননা সালাত ও রোজা ধনী-গরিব সব শ্রেণির মানুষের ওপর ফরজ। আর জাকাত ও হজ ফরজ কেবল ধনীদের ওপর।
ইসলামি শরিয়তের পরিভাষায়, মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে সুবহে সাদিকের আভা ফুটে ওঠার সময় থেকে রোজার নিয়তে সূর্য অস্তমিত হওয়া পর্যন্ত পানাহার ও যৌন সম্ভোগ হতে বিরত থাকার নাম সিয়াম। প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক মুসলিম, স্বাধীন, সুস্থ, বুদ্ধিমান নর-নারীর ওপর পবিত্র রমজান মাসে রোজা পালন করা ফরজে আইন। প্রকৃত তাকওয়া ও আল্লাহর নৈকট্য অর্জনে রোজা এক অতুলনীয় ইবাদত। আত্মসংযম, আত্মনিয়ন্ত্রণ, আত্মশুদ্ধি, আধ্যাত্মিক উন্নতি সাধনে রোজা এক অপরিহার্য ইবাদত। আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন, পারস্পরিক সম্প্রীতি, সহানুভ‚তি ও সাম্য সৃষ্টির ক্ষেত্রেও রোজার ভ‚মিকা অতুলনীয়।
হযরত আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যখন তোমরা (রমজানের) চাঁদ দেখবে, তখন থেকে রোজা রাখবে আর যখন (শাওয়ালের) চাঁদ দেখবে, তখন থেকে রোজা বন্ধ করবে। আকাশ যদি মেঘাচ্ছন্ন থাকে তবে ত্রিশ দিন রোজা রাখবে।
পবিত্র রমজানুল মুবারকের ফজিলত সম্পর্কে অসংখ্য হাদিস বর্ণিত হয়েছে। যেমন-হজরত আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, তিনি যখন এক দিন নবী (সা.)-কে বলেছিলেন, ‘ইয়া রাসুলাল্লাহ! আমাকে অতি উত্তম কোনো নেক আমলের নির্দেশ দিন। রাসুলুল্লাহ (সা.) তখন বললেন, ‘তুমি রোজা পালন করো। কারণ এর সমমর্যাদার আর কোনো আমল নেই।
রমজান মাসকে বলা হয় রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের মাস। এর প্রথম দশ দিন রোজা পালনকারীদের প্রতি আল্লাহর বিশেষ রহমত অবিরত ধারায় বর্ষিত হতে থাকে। দ্বিতীয় দশ দিন আল্লাহ তায়ালা ক্ষমা করেন। ব্যক্তি তার বিভিন্ন ধরনের অপরাধের জন্য তওবা করলে এ সময়ে তা কবুলের বিশেষ সুযোগ রয়েছে। আর শেষ দশ দিন হলো আজাব থেকে নাজাতের সময়। এ সময় আল্লাহ পাক জাহান্নামিদের মধ্য থেকে নির্বাচিত ব্যক্তিদের শাস্তি মওকুফ করে দেন।
পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাওয়ার পর এ সময়ে সব মানুষ এক জায়গায় সমবেত হবে। সূর্য সবার অত্যন্ত নিকটবর্তী হবে অর্থাৎ মাথার খানিকটা ওপরে অবস্থান করবে। প্রচণ্ডতম সূর্যতাপ থেকে বাঁচার জন্য কোনো ছায়া থাকবে না। এমন অবস্থায় রোজার কল্যাণে পাবে আরশের ছায়া। সেখানে তারা পরম শান্তিতে বিচারের জন্য অপেক্ষা করতে থাকবে। আর বিচার কার্যের ক্ষেত্রে তারা বিশেষ সুবিধা পাবে। রোজা তাদের মুক্তির জন্য সুপারিশ করবে এবং সে সুপারিশ গৃহীত হবে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘রোজা ও কুরআন বান্দার জন্য সুপারিশ করবে।’
যথাযথভাবে পালন করা রোজা কেবল আল্লাহর জন্যই হয়ে থাকে। এতে লোক দেখানোর ইচ্ছে প্রবল হতে পারে না। ব্যক্তি বিশেষ একান্ত নিজস্ব পরিচর্যায় তার মিথ্যাচার, গিবতের অভ্যাস রমজান মাসেই পরিত্যাগ করে। কারও সঙ্গে পারতপক্ষে ঝগড়া-ফ্যাসাদ করে না। তার মধ্যে আল্লাহর নির্দেশ ও ভালোবাসাই কার্যকর থাকে। ফলে রোজার মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালার অগাধ সন্তুষ্টি ও ভালোবাসা লাভ করে।
আল্লাহ তায়ালা পরম সত্তা। তাঁর সাক্ষাৎ ও সান্নিধ্য লাভ মানুষের জন্য এক পরম পাওয়া। তিনি সব সুন্দরের উৎস, সব গুণাবলির সমন্বয়। তার দিদার লাভ হলো চ‚ড়ান্ত সাফল্য। তাকওয়াবান সব মানুষেরই প্রথম প্রার্থনা হয় আল্লাহর সাক্ষাৎ লাভ করা। রোজা এ প্রার্থনা পূরণের সুযোগ সৃষ্টি করে দেয়। রোজা পালনকারী আল্লাহর সাক্ষাৎ লাভের নিশ্চয়তা পায়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, রোজা পালনকারীর জন্য দুটো আনন্দ। একটি আনন্দ তার ইফতারের সময়। অন্য আনন্দ হচ্ছে তাঁর প্রতিপালকের সঙ্গে সাক্ষাতের সময়।
মানুষের তাকওয়া লাভের অন্যতম পথ হলো রোজা। রোজার মাধ্যমেই একমাত্র তাকওয়া অর্জিত হতে পারে। পাপাচার ও ভীতিপ্রদ বিষয় থেকে আত্মরক্ষা করার নাম তাকওয়া। অন্য কথায় প্রতিটি কাজকর্ম বৈধ হলে করা এবং অবৈধ হলে পরিত্যাগ করার নাম তাকওয়া। এ তাকওয়া গতানুগতিক ইবাদত-বন্দেগিতে সৃষ্টি হয় না। তাকওয়া প্রচণ্ড সাধনার মাধ্যমেই অর্জন করা সম্ভব। আর রোজা হচ্ছে সে সাধনার উৎস। প্রকৃত খোদাভীতি একমাত্র রোজার মাধ্যমেই অর্জন সম্ভব।
রমজান মাস হচ্ছে বাস্তব প্রশিক্ষণ ও প্রস্তুতি গ্রহণের মাস। আর এই প্রশিক্ষণের দিকনির্দেশক হচ্ছে আল-কুরআন। অর্থাৎ রমজানের সিয়াম সাধনার মধ্য দিয়ে আল কুরআন অনুসারে মানুষ তাকওয়া অবলম্বন করবে। আর সাধারণত রমজান মাসে জাকাত বণ্টন করা হয়। অন্যান্য মাসের তুলনায় রমজান মাসের দানে বহুগুণ বেশি সওয়াব বলে এ সময়ে দানের পরিমাণও বৃদ্ধি পায়। আর রোজার শেষের দিকে এসে শরিয়তের নির্ধারণ অনুযায়ী ব্যক্তি তার নিজের ও পরিবারের পক্ষ থেকে ফিতরা আদায় করে থাকে। এভাবে রোজা সমাজের লোকদের মধ্যে প্রয়োজনীয় আর্থিক উপযোগ তৈরি করে।
প্রতি বছরই রমজান মাস আসে কুরআন অবতীর্ণ হওয়ার প্রসঙ্গ স্মরণ করিয়ে দেওয়ার জন্য, যাতে মানুষ তাদের বাস্তব জীবনে কুরআনের প্রতিফলন ঘটায়। ব্যক্তি ও সমাজ প্রতিষ্ঠা করে আল্লাহ ও বান্দার মধ্যে নিবিড় সম্পর্ক গড়ে ওঠে রোজার ভেতর দিয়ে। আল্লাহর নৈকট্য লাভ করা যায় রোজা পালনের মাধ্যমে। আর রোজা সমাজের অবহেলিত দিনমজুর মানুষের প্রতি উদারতা ও সদ্ব্যবহারের শিক্ষা দেয়। রমজান মাসে শ্রমিকদের কাজ কিছুটা হালকা করার জন্য রাসুল (সা.) নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘এ মাসে যারা দাস-দাসীর প্রতি সদয় ব্যবহার করে, তথা তার কাজের বোঝা হালকা করে আল্লাহ তাদের ক্ষমা করে দেন।’
রোজা সমাজের বিত্তবান মানুষদের মনে বিত্তহীনদের জন্য প্রবল ভালোবাসা ও সহানুভ‚তি সৃষ্টি করে। স্বাভাবিকভাবে সম্পদশালী মানুষের না খেয়ে থাকার দরকার হয় না। সে জন্য সে বুঝতে পারে না অনাহারে থাকার কষ্ট কেমন। রোজার মাধ্যমে বিত্তশালী-বিত্তহীন নির্বিশেষে সবাই সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত কোনো রকম খাদ্য গ্রহণ করে না। এর ফলে সমাজের ধনী মানুষগুলো ক্ষুধার তীব্র কষ্ট সম্পর্কে বাস্তব অভিজ্ঞতা লাভ করে। যার ফলে সমাজের অনাহারী সদস্যদের দুঃখ-কষ্টের ব্যাপারে তার মধ্যে গভীর সহানুভ‚তি সৃষ্টি হয়।
আত্মশুদ্ধি ও চরিত্র গঠনের জন্য রোজার ভ‚মিকা অপরিসীম। সৎ স্বভাব ও নিষ্কলুষ চরিত্রের জন্য রোজার প্রশিক্ষণ অত্যধিক কার্যকর। পানাহার ও যৌন সম্ভোগ না করা রোজার বাহ্যিক ক্রিয়া। অন্তর্নিহিত হাকিকত হচ্ছে মানুষের যাবতীয় কাজকর্ম ও ব্যবহার পরিশুদ্ধ করে তোলা, মানব সমাজে শান্তি, সুন্দর ও সত্যের প্রবাহ সৃষ্টি করা, মানুষে মানুষে, সমাজে সমাজে কোনো ধরনের দ্ব›দ্ব-কলহ না থাকা। সুতরাং এ কথা স্পষ্ট যে, পানাহার ও যৌন সম্ভোগের মতো নির্দিষ্ট কিছু বিষয় থেকে নিবৃত্ত থাকলেই রোজা সফল হয়ে ওঠে না; বরং আল্লাহদ্রোহী যাবতীয় বিষয় থেকে নিবৃত্ত থাকলেই কেবল রোজার প্রকৃত উদ্দেশ্য হাসিল হয়। রোজা দ্বারা যদি পার্থিব লোভ-লালসা থেকে মুক্ত হয়ে আল্লাহর সান্নিধ্য লাভ করা না যায় তবে সে রোজা উপবাস ছাড়া আর কিছু লাভ হয় না।
সিয়াম তথা রোজা পালনে যে শুধু পারলৌকিক গুরুত্ব রয়েছে এমন নয় বরং এর ইহলৌকিক ও বৈষয়িক গুরুত্বের বিষয়টিও অস্বীকার করা যায় না। প্রখ্যাত জার্মান চিকিৎসক ডা. হেলমুট লুটজানার ভাষায় মানুষের শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রতঙ্গের গঠন ও কার্যপ্রণালি বিশ্লেষণ করে নিরোগ, দীর্ঘজীবী ও কর্মক্ষম স্বাস্থ্যের অধিকারী হতে হলে বছরের কতিপয় দিন উপবাসের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। ডা. লুটজানারের মতে, ‘খাবারের উপাদান থেকে সারা বছর ধরে মানুষের শরীরে জমে থাকা কতিপয় বিষাক্ত পদার্থ (টক্সিন), চর্বি ও আবর্জনা থেকে মুক্তি পাওয়ার একমাত্র সহজ ও স্বাভাবিক উপায় হচ্ছে উপবাস। উপবাসের ফলে শরীরের অভ্যন্তরে দহনের সৃষ্টি হয় এবং এর ফলে শরীরের অভ্যন্তরে জমে থাকা বিষাক্ত পদার্থগুলো দগ্ধীভ‚ত হয়ে যায়।’ সিয়াম পালনের ফলে মানুষের শরীরে কোনো ক্ষতি হয় না বরং অনেক কল্যাণ সাধিত হয়।
মূলত পবিত্র মাহে রমজান আত্মশুদ্ধি, আত্মগঠন, প্রশিক্ষণ ও আত্মসংশোধনের মাস। কারণ, এ মাসেই কঠোর সিয়াম ও কিয়াম সাধনার মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালার সঙ্গে বান্দার সম্পর্ক গভীর হয় এবং নফসের দাসত্বের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা যায়। মানুষ যাতে মাসব্যাপী কঠোর অনুশীলনের মাধ্যমে আত্মশুদ্ধি এবং প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে তাকওয়া ও তাজকিয়া অর্জনের মাধ্যমে আত্মগঠন করতে পারে এ জন্যই আল্লাহ পাক আমাদের জন্য সিয়াম পালনকে অত্যাবশ্যকীয় করে দিয়েছেন। আর আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করে ইহকালীন কল্যাণ ও পরকালীন মুক্তির অন্যতম ও অপরিহার্য মাধ্যমই হচ্ছে সিয়াম সাধনা।
সংবাদটি ভালো লাগলে স্যোশাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন