এশিয়ার প্রাচীনতম বাংলা সংবাদপত্র প্রথম প্রকাশ ১৯৩০

প্রিন্ট রেজি নং- চ ৩২



……………………………

নিরাপত্তাহীন বিছানাকান্দি বাস্তবায়ন হয়নি ইকোপার্কের পরিকল্পনা

Daily Jugabheri
প্রকাশিত time ago 3 hours
নিরাপত্তাহীন বিছানাকান্দি বাস্তবায়ন হয়নি ইকোপার্কের পরিকল্পনা

মনসুর আলম, গোয়াইনঘাট ::: সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র বিছানাকান্দি। ভারতের মেঘালয় পাহাড় থেকে নেমে আসা স্বচ্ছ জলধারা, পাথরের বিস্তীর্ণ প্রান্তর এবং পাহাড়ঘেরা প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখতে প্রতিদিনই এখানে ভিড় করেন দেশ-বিদেশের হাজারো পর্যটক। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুম ও সাপ্তাহিক ছুটির দিনে পর্যটকের ঢল নামে।

কিন্তু পর্যটকের সংখ্যা বাড়লেও নিরাপত্তা ও সেবার মান সেই তুলনায় উন্নত হয়নি। বৃহস্পতিবার দুপুর থেকে বিকেল পর্যন্ত সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, নৌযান পরিচালনায় নিরাপত্তা বিধির যথাযথ অনুসরণ নেই, অধিকাংশ নৌকায় লাইফ জ্যাকেট ব্যবহার করা হচ্ছে না, পর্যাপ্ত সতর্কীকরণ সাইনবোর্ডও চোখে পড়েনি। জিরো পয়েন্ট এলাকায় দায়িত্বশীল নিরাপত্তা ব্যবস্থাও দৃশ্যমান ছিল না।
সরেজমিনে দেখা যায়, পর্যটক পরিবহনে ব্যবহৃত প্রায় সব নৌকাই লাইফ জ্যাকেট ছাড়াই চলাচল করছে। কোথাও কোথাও ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি যাত্রী বহনের অভিযোগও পাওয়া যায়। অথচ বর্ষাকালে স্রোত বেড়ে যাওয়ায় যেকোনো দুর্ঘটনা বড় ধরনের প্রাণহানির কারণ হতে পারে।

স্থানীয়দের ভাষ্য, প্রতিবছরই সাঁতার না জানা পর্যটকরা স্বচ্ছ পানিতে নেমে দুর্ঘটনার শিকার হন। অতীতেও ডুবে মৃত্যুর একাধিক ঘটনা ঘটেছে।
ঢাকার সাভার থেকে ঘুরতে আসা পর্যটক মাহমুদুল হাসান বলেন, বিছানাকান্দির প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অসাধারণ। কিন্তু পর্যটকদের জন্য মৌলিক সুযোগ-সুবিধার অনেক ঘাটতি রয়েছে। নৌকার ভাড়া তুলনামূলক বেশি, খাবারের দামও চড়া। নারী পর্যটকদের জন্য পোশাক পরিবর্তনের কোনো চেঞ্জিং রুম নেই। সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, এখানে মানসম্মত কোনো আবাসিক হোটেল, মোটেল বা রেস্টহাউস নেই। ফলে দূর-দূরান্ত থেকে আসা পর্যটকদের একই দিন ফিরে যেতে হয় অথবা অন্য এলাকায় গিয়ে রাতযাপনের ব্যবস্থা করতে হয়।
চট্টগ্রাম থেকে আসা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী সাজিদ আহমেদ বলেন, ভালো মানের কোনো রেস্টুরেন্ট নেই। যেগুলো আছে, সেখানে খাবারের মান সন্তোষজনক নয়, অথচ দাম অনেক বেশি। প্রশাসনের এসব বিষয়ে নজর দেওয়া প্রয়োজন।
নৌকার মালিক শামিম আহমদ বলেন, সব সময় পর্যাপ্ত পর্যটক পাওয়া যায় না। অনেক দিন লোকসান হয়। তাই কোনো কোনো সময় বেশি ভাড়া নিতে হয়।
বিছানাকান্দি ক্ষুদ্র পর্যটন শিল্প ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি লিলু মিয়া বলেন, শুক্রবার ও শনিবার ব্যবসা ভালো হয়। অন্য দিন পর্যটক কম থাকায় কোনোরকম টিকে থাকতে হয়। সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ পর্যটন খাতকে গুরুত্ব দিলে এই এলাকার অর্থনীতি আরও সমৃদ্ধ হবে।
সরেজমিনে পর্যটকদের নিরাপত্তায় টুরিস্ট পুলিশ বা স্বেচ্ছাসেবী কোনো টিমকে দায়িত্ব পালন করতে দেখা যায়নি। জিরো পয়েন্ট এলাকায় সীমান্ত নিরাপত্তায় বিজিবির একজন সদস্যকে দায়িত্ব পালন করতে দেখা গেছে।

তবে বিছানাকান্দি টুরিস্ট পুলিশ জোনের ইনচার্জ ওসি মো. ওমর ফারুক মোল্লা দাবি করেন, টুরিস্ট পুলিশ নিয়মিত দায়িত্ব পালন করছে। তিনি বলেন, নৌকার মাঝিদের লাইফ জ্যাকেট ব্যবহারের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
হাদারপাড় নৌঘাট এলাকায় বাজারের ময়লা-আবর্জনার স্তূপ দেখা গেছে। এসব বর্জ্যের একটি অংশ নদীর পানিতে মিশে যাচ্ছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। এতে পরিবেশ দূষণের পাশাপাশি পর্যটন এলাকার সৌন্দর্যও ক্ষুণ্ন হচ্ছে।
বিছানাকান্দির পরিবেশ সংরক্ষণ ও পর্যটন উন্নয়নের লক্ষ্যে ২০১৮ সালে প্রায় ৩৪ দশমিক ৫৯ একর জমিতে ইকোপার্ক বা ইকো-ট্যুরিজম প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছিল। প্রকল্পের আওতায় প্রায় ১০ হাজার বনজ ও ঔষধি গাছ রোপণ, আধুনিক ওয়াশরুম, নারী-পুরুষের পৃথক চেঞ্জিং রুম, বসার স্থান এবং স্থানীয়দের কর্মসংস্থানের পরিকল্পনা ছিল।
কিন্তু সরেজমিনে ওই প্রকল্প এলাকার অধিকাংশ অংশই ফাঁকা পড়ে থাকতে দেখা গেছে। অতীতে রোপণ করা গাছেরও তেমন কোনো দৃশ্যমান অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। পরিকল্পিত অবকাঠামোরও বাস্তবায়ন হয়নি।
বিছানাকান্দি ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসক মো. বদরুল ইসলাম বলেন, পর্যটকদের অনেক অভিযোগ উপজেলা প্রশাসনের আওতাভুক্ত। তবে বিছানাকান্দিকে আধুনিক পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি।
গোয়াইনঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রতন কুমার অধিকারী বলেন, অতীতের ইকোপার্ক প্রকল্পের বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে। পর্যটকদের অভিযোগ এবং নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিষয়গুলোও সরেজমিনে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সরেজমিনে জিরো পয়েন্ট সংলগ্ন সীমান্ত এলাকায় কিছু শ্রমিককে পাথর বহন করতে দেখা গেছে। এ প্রতিবেদকের কাছে এ-সংক্রান্ত ভিডিওচিত্র সংরক্ষিত রয়েছে। বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়ার চেষ্টা চলছে।
বিছানাকান্দি দেশের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র। বছরে বিশেষ বিশেষ সময়ে লাখো পর্যটকের সমাগম ঘটে, আর সাপ্তাহিক ছুটির দিনগুলোতে হাজার হাজার মানুষ ছুটে আসেন প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য উপভোগ করতে। বর্ষাকালে মেঘালয়ের সবুজ পাহাড়, সাদা মেঘের ভেলা এবং পাহাড়ি জলধারার মিলনে বিছানাকান্দি যেন নতুন রূপে ধরা দেয়।

কিন্তু এই সম্ভাবনাময় পর্যটনকেন্দ্রে নিরাপত্তা জোরদার, নৌযান পরিচালনায় কঠোর তদারকি, নারী পর্যটকদের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ নিশ্চিতকরণ এবং স্থগিত উন্নয়ন প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন না হলে পর্যটন শিল্পের টেকসই বিকাশ বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যাবে।

সংবাদটি ভালো লাগলে স্যোশাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন
07 August 2026

নিরাপত্তাহীন বিছানাকান্দি বাস্তবায়ন হয়নি ইকোপার্কের পরিকল্পনা

বিস্তারিত কমেন্টে