
কালের আবর্তে ঘুরে গেল চল্লিশটি বছর। এরই মধ্যে আনন্দ বেদনা বিজড়িত কত ঘটনাই ঘটে গেছে। তার সব কিছু ব্যস্ত জীবনের মণিকোঠায় সঞ্চয় করে রাখতে পারিনি। বেঁচে থাকার তাগিদে পোষ্যদের মানুষ করে গড়ার মানসে, সামাজিক বন্ধনে সবাই ব্যস্ত। অবসর নেই, তবুও তারই মধ্যে ভুলতে পারিনা তাদের যারা শিক্ষাবঞ্চিত, নিপীড়িত, নির্যাতিত মানুষের জন্য পরোপকারের মহৎ উদ্দেশ্যে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন। এদের স্মরণ না করলে তাদের বিদেহী আত্মার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন না করলে অবশ্যই ভবিষ্যত বংশধররা বিকৃত ইতিহাস পড়তে বাধ্য হবে যা আদৌ কাম্য নয়। শিক্ষানুরাগী, সমাজসেবী মরহুম আমীনূর রশীদ চৌধূরী এমন একজন ব্যতিক্রমী ব্যক্তি যিনি মরেও অমর, যাকে ভুলা যায়না। যে ব্যক্তি উপার্জিত অর্থ শুধুমাত্র ব্যক্তিগত ভোগে ব্যয় করেননি অকাতরে ব্যয় করেছেন গরীব দুঃখীদের শিক্ষা দিক্ষা ও জ্ঞান অর্জনে সহায়তা করে।
আমীনূর রশীদ চৌধূরী আজ যদিও আমাদের মধ্যে নেই, কিন্তু তাঁর ব্যক্তিত্ব, কর্মধারা ও সমাজ জীবনে তাঁর অবদান তাকে আমাদের নিকট চির জাগরুক করে রাখবে। ঐশ্বর্যশালী, বিত্তশালী হয়েও সমাজের দরিদ্র জনগণ থেকে তিনি কখনো দূরে সরে থাকেননি, তাদের আপন করে নিয়েছিলেন। নিজেও ছিলেন অত্যন্ত মেধাবীসম্পন্ন উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত একজন মানুষ। তাই শিক্ষার কদর জানতেন। কিভাবে একটা অসহায় অশিক্ষিতকে আলোর পথ দেখানো যায় সে চিন্তা সব সময় তার মনে উকিঝুঁকি দিত। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সমাজের দরিদ্র ও মেধাবী ছাত্র ছাত্রীদের যেভাবে তিনি আর্থিক সাহায্য দিয়ে লেখাপড়ায় উৎসাহ দিতেন, অনপ্রানিত করতেন। আমি নিজে যখন কলেজের ছাত্র ছিলাম তখন তা প্রত্যক্ষ করেছি। বুঝতে পেরেছি তার মধ্যে কতটুকু মহানুভবতা ছিল, কত প্রশস্ত ছিল তার হৃদয় ও মন। বলতে দ্বিধা নেই আমার সাংবাদিকতার হাতেকড়ি আমীনূর রশীদ চৌধূরীর হাত ধরেই। আমি শ্রদ্ধাভরে আজ তাঁকে স্মরণ করছি।
সিলেট থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক, পরবর্তী পর্যায়ে দৈনিক যুগভেরী পত্রিকার সম্পাদক অমিত ঐশ্বর্যের অধিকারী আমীনূর রশীদ চৌধূরী এ অঞ্চলের সংস্কার ও সমাজ উন্নয়ন মূলক কাজে সবসময়ই নিজেকে জড়িয়ে রাখতেন। তাঁর দেশপ্রেমে বিশেষ করে সিলেটের ব্যাপারে কোন খাদ ছিল না। আমি তাঁকে কোন দিন কোন সামাজিক কাজে বা সিলেটের স্বার্থে রাজরোষের ভয়ে পিছিয়ে যেতে দেখিনি। তিনি একজন স্পষ্টবাদী, নির্ভীক ব্যক্তি ছিলেন। দূর্নীতিপরায়ন আমলাদের তিনি কঠোর ভাষায় সমালোচনা করতেন।
আমীনূর রশীদ চৌধূরী ১৯১৫ সালের ১৭ নভেম্বর জন্মগ্রহণ করেন কলকাতার জামনগর রোডের ৩১নং বাড়িতে। তাঁর পিতা ছিলেন বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ আব্দুর রশীদ চৌধুরী ও মাতা রাজিয়া রশীদ চৌধুরী। তাঁদের মাতৃনিবাশ সুনামগঞ্জ জেলার দরগাপাশা গ্রামে। তিনি কলকাতার বয়েজ স্কুল, সিলেটের রাজা জিসি হাইস্কুল, এমসি কলেজ হয়ে আলিগড় বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর শিক্ষাজীবন সম্পন্ন করেন।
আমীনূর রশীদের মত স্পষ্টভাষী, ন্যায়পরায়ন, নিঃস্বার্থ, সৎ, দৃঢ়চিত্তলোক বর্তমান সমাজে সত্যিই বিরল। তাঁর অসাধারণ ধীশক্তি, কর্ম নৈপূণ্য, অধ্যবসায়, আন্তরিকতা সর্বোপরি মানুষের প্রতি গভীর প্রেম ও অকৃত্রিম ভালবাসা ও মমত্ববোধ তাঁকে অমর করে তুলেছে। তাঁর জীবনের বিভিন্ন দিক স্বল্প পরিসরে তুলে ধরা সত্যিই কঠিন। বেশ কিছুদিন আমীনূর রশীদ চৌধূরীর সান্নিধ্যে থেকে তাঁর মধ্যে সাহস দেখেছি, স্পষ্টভাষিতা দেখেছি, জনসাধারণ ও সমাজের কল্যাণ করার সদিচ্ছা ও মানসিকতা দেখেছি। সরকারী কর্মকর্তা বা বুর্জোয়াদের দোষ ত্রুটি তিনি নির্দ্বিধায় প্রকাশ করতেন তাঁর লেখনি ও কথাবার্তার মাধ্যমে।
আমীনূর রশীদ চৌধূরীর আম্বরখানাস্থ বাসাটি ছিল সাধারণ ও দুঃখী মানুষের আশ্রয়স্থল। সমাজের বিভিন্ন স্তরের সমস্যাগ্রস্ত মানুষ তাঁর কাছে ছুটে যেতেন নানা সমস্যা সমাধানের আশায়। কাউকে পরামর্শ দিয়ে কাউকে অর্থ দিয়ে বা কারো সুখে সুখী এবং দুঃখের সমব্যথী হয়ে তিনি তাদের পাশে দাঁড়াতেন। গরীবের ছেলে স্কুলের ফি দিতে পারছেনা দৌড়ে গেল আমীনূর রশীদের কাছে, মেয়ের বিয়ের টাকা নেই, ভরসা আমীনূর রশীদ চৌধূরী। বিচার পাচ্ছেন না- দূর্নীতি চলছে দৌড়ে গেলে তাঁর কাছে তিনি সবই শুনতেন ও তদবির করতেন বিনা স্বার্থে তা যে ভাবেই হোক। অন্যায় জুলুম আর দূর্নীতির বিরুদ্ধে আজীবন সংগ্রামী সোচ্চার ও প্রতিবাদী এ মানুষটি ছিলেন সত্যিই সবার কাছে আশার আলো।
সাধারণ লোকের, আপনজনদের বিপদে আপদে তিনি যেমন ঝাপিয়ে পড়তেন তেমনি কঠোর হয়ে উঠতেন কারো অন্যায় দেখলে। নীতির ব্যাপারে যতদূর জানি তিনি কখনো আপোষ করেননি। যে কাজ তাঁর কাছে অন্যায় বলে মনে হয়েছে এর বিরুদ্ধে তাঁর প্রতিবাদী কন্ঠ ছিল দুর্দম।
বাহির বিস্তর বোঝা
ধন বলে তায়
কল্যাণ সে অন্তরের
পরিপূর্ণতায়।
আমীনূর রশীদ চৌধূরী শুধু বাহিরের অর্থে বিত্তবান ছিলেন না অন্তরেও ছিলেন ধনী। ৪০বছর পূর্বে ১৯৮৫ সালের ৩০শে আগস্ট তিনি ইহ জগতের মায়া কাটিয়ে, পরপারে পাড়ি দেন কিন্তু জীবনকে কোথাও কোন দিক দিয়ে অপূর্ণ রাখেননি। সিলেটসহ সারা দেশবাসী আজও তাঁকে শ্রদ্ধা ও সম্মানের সাথে স্মরণ করেন, আমার বিশ্বাস এটা অব্যাহত থাকবে যুগযুগ ধরে। আজকের দিনে আমি তাঁর আত্মার মাগফেরাত কামনা করছি কায়মনোবাক্যে মহান রাব্বুল আলামিনের দরবারে।
সংবাদটি ভালো লাগলে স্যোশাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন