
নিজস্ব সংবাদদাতা, মধ্যনগর:
আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সম্ভাব্য সময় ডিসেম্বর থেকে আগামী বছরের জুন মাস। এমনটিই বারবার বলছেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের বিভিন্ন উপদেষ্টা ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। সেজন্য সম্ভাব্য প্রার্থীরা ভোটারদের হৃদয় জয় করে দলের কাছে নিজের মনোনয়ন নিশ্চিত করতে বেশি তৎপর। ইতোমধ্যে প্রচার—প্রচারণায় নেমেছেন মনোনয়ন প্রত্যাশীরা। জেলার পাঁচটি আসনের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছে সুনামগঞ্জ-১ (তাহিরপুর, জামালগঞ্জ, ধর্মপাশা ও মধ্যনগর) আসন। পাঁচটি আসনের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সম্পদে সমৃদ্ধ এই আসন।
এই আসনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপজেলা হচ্ছে তাহিরপুর উপজেলা। পর্যটন সমৃদ্ধ ও খনিজ সম্পদে ভরপুর হওয়ায় এই আসনের প্রতি সবার নজর। জেলার সবচেয়ে বেশি হাওরের অবস্থান এই উপজেলায়। মাছের প্রাকৃতিক অভয়ারণ্য টাঙ্গুয়ার হাওরও তাহিরপুরে। আয়তন ও ভোটের দিক থেকে সুনামগঞ্জের সবচেয়ে বড় আসন এটি। শুধুমাত্র বিএনপির হয়ে আধাডজনের বেশী মনোনয়ন প্রত্যাশী রয়েছেন এই আসনে। ধানের শীষ প্রতীকে দলীয় মনোনয়ন পেতে চান সাতজন প্রার্থী। এছাড়াও আসনটিতে জামায়াত, জাতীয় পার্টি, এবি পার্টি, এনসিপি, জাসদ, সিপিবি, গণঅধিকার পরিষদ, ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলন সহ বিভিন্ন ইসলামি দলগুলোর প্রার্থী থাকতে পারে।
জানা গেছে, দেশের বৃহত্তম রাজনৈতিক দল বিএনপির তৃণমূলের ভোটাদের মাঝে আলোচনায় আছেন এই আসনে দলীয় সংসদ সদস্য হওয়ার ৮ জন প্রার্থী। তারা হলেন— আব্দুল মোতালীব খান, আনিসুল হক, কামরুজ্জামান কামরুল। তারা তিনজনই বিএনপির জেলা আহবায়ক কমিটির সদস্য। এছাড়াও মনোনয়ন পেতে গণসংযোগ করছেন সাবেক এমপি নজির হোসেন পতœী সালমা নজির। মনোনয়ন চান যুক্তরাজ্য জাতীয়তাবাদী আইনজীবী দলের সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার হামিদুল হক আফিন্দী। মনোনয়ন চাইতে পারেন, জেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম সম্পাদক মামুনুর রশিদ শান্ত, কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সহ সভাপতি মো. নিজাম উদ্দীন।
আওয়ামী লীগ নির্বাচনে না থাকলে আসনটিতে ভোটের হিসেবে দ্বিতীয় বৃহত্তম দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। তাদের একক প্রার্থী জেলা জামায়াতের আমীর মাওলানা তোফায়েল আহমদ খান। তাঁর বাড়ি তাহিরপুর উপজেলার বড়দল গ্রামে। তিনি নিয়মিত গনসংযোগ করছেন।
জেলা জাতীয় পার্টির সূত্র জানিয়েছে, এই আসনে তাদের একাধিক প্রার্থী রয়েছেন। তবে একজনকে বাছাই করে দলীয় মনোনয়ন দেওয়া হবে।
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) এবার সুনামগঞ্জ—১ আসনে দলীয় প্রার্থী হিসেবে দলের সাবেক জেলা সভাপতি মধ্যনগর উপজেলার বাসিন্দা অধ্যাপক চিত্তরঞ্জন তালুকদারকে মনোনয়ন দিচ্ছে। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন জেলা সিপিবির সভাপতি অ্যাডভোকেট এনাম আহমদ।
জাসদ (ইনু) জেলা সম্পাদক সালেহীন শুভ জানান, সুনামগঞ্জ— ১ সংসদীয় আসনে তাদের দলীয় প্রার্থী নাও থাকতে পারেন।
এনসিপিও এই আসনে প্রার্থী দেবে। দলের কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক অনিক রায় বলেছেন, এই আসনে প্রার্থীতা চূড়ান্ত হয় নি। অনেকেই আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। গণঅধিকার পরিষদের প্রার্থী থাকতে পারে বলে দলটির জেলার দ্বায়িত্বশীলরা জানিয়েছেন।
অন্যান্য ইসলামি দলগুলো থেকে আসতে পারেন একাধিক প্রার্থী।
বিএনপির দলীয় সূত্র জানায়, সুনামগঞ্জ-১ আসনে বিএনপির মনোনয়ন চাইছেন ধর্মপাশা উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান আবদুল মোতালীব খাঁন। বর্ষীয়ান এই রাজনীতিবিদ দলীয় মনোনয়ন পেয়ে দুইবার ধর্মপাশা উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে অংশ নেন এবং উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। ওয়ান ইলাভেনে বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া কারা অন্তরীন হলে আবদুল মোতালীব খাঁন বেগম জিয়ার সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রেখেছেন। মাইনাস টু ফর্মূলা তথা সংস্কারপন্থীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়ে দলীয় নেতা—কর্মীদের মাঝে ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করেন।তিনি বলেন, বিএনপি ক্লীন ইমেজের প্রার্থীকে মনোনয়ন দেবে। এজন্য দলীয় মনোনয়ন পেতে আমি আশাবাদী। তিনি আরও বলেন, আমার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে দলীয় শৃঙ্খলা পরিপন্থী কোনো কাজ করি নি। যে কারণে বিএনপি আমার নামে কখনো কোনো শাস্তিমূলক আদেশ বা বহিষ্কার আদেশ দেয় নি। এখানে অনেকেই আছেন যাদে কে দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের দায়ে বহিষ্কার করা হয়েছিল। মনোনয়ন পেলে আমার বিজয় সুনিশ্চিত।
এই আসনের আরেক মনোনয়ন প্রত্যাশী, তাহিরপুর উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও কেন্দ্রীয় কৃষকদলের যুগ্ম সম্পাদক, জেলা বিএনপির সাবেক সহসভাপতি এবং জেলা বিএনপির আহবায়ক কমিটির অন্যতম সদস্য আনিসুল হক। একাধারে সফল ব্যবসায়ী ও সফল রাজনীতিবিদ আনিসুল হক দীর্ঘদিন ধরে তিনি নির্বাচনী এলাকায় গণসংযোগসহ দুর্যোগ ও দুর্বিপাকে দলীয় নেতা—কর্মীদের পাশে থেকে একজন সজ্জন রাজনীতিবিদ হিসেবে নিজের ইমেজ সৃষ্টি করেছেন।
তিনি বলেন, জাতীয়তাবাদী কৃষকদলের সুনামগঞ্জ জেলার সাংগঠনিক দ্বায়িত্বপ্রাপ্ত হয়ে জেলার পাঁচটি আসনে তৃণমূল পর্যায়ে কৃষকদের বিএনপি’র রাজনীতিতে সক্রিয় করার জন্য লাগাতার কর্মসূচী বাস্তবায়নে কাজ করে যাচ্ছি। বিগত ফ্যাসিবাদ বিরোধী প্রতিটি আন্দোলনে জেলায় ও সুনামগঞ্জ— এক নির্বাচনী এলাকায় সর্বাত্মক ভূমিকা পালন করেছি। এখন যারা মনোনয়ন চাচ্ছেন তাদের কেউ কেউ সেই দুঃসময়ে দেশের বাইরে অবস্থান করেছেন। আমি বিশ্বাস করি, আমার কাজের ম্ল্যূায়ন করে দল আমাকে মনোনয়ন দেবে।
আসনটিতে বিএনপির আরেক মনোনয়ন প্রত্যাশী রাজনীতিবিদ কামরুজ্জামান কামরুল। তরুণদের কাছে জনপ্রিয় এই নেতাও তাহিরপুর উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান। জেলা বিএনপি’র সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক ও জেলা বিএনপির আহবায়ক কমিটির তরুণ সদস্য কামরুজ্জামান কামরুল আসনের চারটি উপজেলার গ্রামপর্যায়ে বিরামহীন গণসংযোগ চালিয়েছেন সম্প্রতি।
কামরুজ্জামান কামরুল বলেন, আমি এলাকায় গণসংযোগ শুরু করেছি, আমি তাহিরপুর উপজেলার সন্তান। তবে আমার প্রতি সুনামগঞ্জ—১ নির্বাচনী এলাকার চারটি উপজেলার নেতাকর্মীদের অনেক সমর্থন রয়েছে। এলাকায় চাঁদাবাজি, দখলদারিত্বসহ সকল অপকর্মের বিরুদ্ধে আমি সব সময় সোচ্চার। সাধারণ মানুষের আস্থা অর্জনে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করে যেতে চাই। আগামী জাতীয় নির্বাচনে বিএনপির দলীয় প্রার্থী হিসেবে এ আসনে আমি দলের মনোনয়ন চাইবো, দল আমাকে প্রার্থী করলে বিপুল ভোটে বিজয়ী হবো।
সাবেক এমপি নজির হোসেন পতœী সালমা নজির সম্প্রতি তাহিরপুর উপজেলা আহবায়ক কমিটির সদস্য হয়েছেন। তাঁর স্বামী তিনবারের সাবেক এমপি এবং জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও সভাপতি ছিলেন। রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান ও একজন ক্ষণজন্মা রাজনীতিকের সহধর্মিণী হয়ে তিনি এ আসনের চারটি উপজেলায় গণসংযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন। তিনি বলেন, দল ক্লীন ইমেজের প্রার্থীকে মনোনয়ন দিতে চায়। তাই আমার মনোনয়ন পাওয়ার সম্ভাবনা বেশী। তিনি আরও বলেন, আমার স্বামী প্রয়াত নজির হোসেন এ আসনে তিনবারের এমপি ছিলেন। আমি এমপি হলে তাঁর অসমাপ্ত কাজগুলোকে বাস্তবায়ন করবো।
মনোনয়ন প্রত্যাশী ব্যারিস্টার হামিদুল হক আফিন্দি ইংল্যান্ডে অবস্থান করায় তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
মনোনয়ন চান জেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম সম্পাদক মামুনুর রশিদ শান্ত। তিনি বলেন,”আমি দলীয় মনোনয়ন চাইবো। দল আমাকে মনোনয়ন দিলে এই আসনে বিএনপির বিজয় নিশ্চিত করবো।
মনোনয়ন চাইবেন জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সহসভাপতি মো. নিজাম উদ্দিন। কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের দায়িত্বপ্রাপ্ত টিম প্রধান হিসেবে তিনি বগুড়া, নাটোর, সিরাজগঞ্জ জেলা ছাত্রদলকে সু—সংগঠিত করার জন্য কাজ করছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর শেষে এমফিল গবেষণারত মো. নিজাম বলেন, বিগত পনেরো বছরে বাংলাদেশে বিএনপির নেতৃত্বে যে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার চলেছে এবং সর্বশেষ জুলাই গণঅভ্যুত্থান সংগঠিত হলো, সেখানে এদেশের তরুণদের অংশগ্রহণ ছিল চোখে পড়ার মতো। আমি মনে করি, নতুন বাংলাদেশ গড়তে রাজনীতিতে তরুণদের অংশগ্রহণ খুব জরুরী। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানও তরুণদের রাজনৈতিক শক্তি, আবেগ, উচ্ছাস এবং প্রত্যাশাকে সব সময়ই প্রমোট করেন। আমি মনে করি আমার দল আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তরুণদের মূল্যায়ন করবে। আমার দল কাজ করার সুযোগ দিলে হাওর অঞ্চলের প্রকৃতি, পরিবেশ, মানুষের জীবন মানের উন্নয়ন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান এবং হাওর কেন্দ্রীক পর্যটনের সম্ভাবনা নিয়ে বৃহত্তর পরিসরে কাজ করতে চাই।
এছাড়া জামালগঞ্জের বাসিন্দা কেন্দ্রীয় যুবদলের সাবেক সহ—সাংগঠনিবক সম্পাদক মাহবুবুর রহমান মাহবুব এলাকায় গণসংযোগ করছেন। তিনিও এখানে মনোনয়ন চাইবেন বলে এলাকার সভা সমাবেশে জানান দিয়েছেন।
জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী জেলা জামায়াতের আমীর ও তাহিরপুর উপজেলার বাসিন্দা মাওলানা তোফায়েল আহমেদ খান বললেন, আমার দলীয় মনোনয়ন নিশ্চিত। এখন নির্বাচনকে সামনে রেখে সুনামগঞ্জ-১ আসনের চারটি উপজেলায় নিয়মিত গণসংযোগ চালিয়ে যাচ্ছি। দলীয় নেতাকর্মীদেরকে সংগঠিত করছি। পাশাপাশি যাতে বাংলাদেশে পুনরায় কোন ফ্যাসিস্ট শক্তির সৃষ্টি না হয়, এজন্য জনগণকে সচেতন করছি।
সিপিবি’র কাস্তে প্রতীকে এ আসনের প্রার্থী অধ্যাপক চিত্তরঞ্জন তালুকদার বলেন, সুনামগঞ্জ—১ নির্বাচনী আসনে আমি নির্বাচিত হলে, হাট—ঘাট—বাজার ইজারার নির্যাতন থেকে জনগণকে মুক্তি দেবো। হাওরের ফসলরক্ষা বাঁধ ব্যবস্থাপনা মাটির বদলে আধুনিক ইঞ্জিনিয়ারিং ব্যবস্থায় আনবো। হাওরকে জলজবৃক্ষ রোপনের মাধ্যমে সবুজায়ন করবোই। নদী—খাল—বিল খনন করে আগামী তিরিশ নাগাদ হাওরের কৃষি নিরাপদ করবো।
সূত্রমতে, আপাতত নিজ নিজ দলীয় ভাবনা বাস্তবায়নেই মনোযোগ দিচ্ছে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীসহ রাজনৈতিক দলগুলো। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা হলে ‘জোট’ নাকি ‘সমঝোতা’ সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে দলগুলো। তবে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দল ও বিগত দিনে ওই সরকারে যুক্ত রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে জোট বা সমাঝোতার কোনো চিন্তা নেই বিএনপি ও জামায়াতের। এই দুইদল ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে যুক্ত রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সম্পর্ক বাড়িয়েছে।
বিএনপি ও জামায়াতের একাধিক নেতা জানান, আগামী নির্বাচনে জোট গঠন নিয়েই তারা বিভিন্ন দলের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন। জোট অথবা মঞ্চ যে কোনো নামেই তা গঠন হতে পারে। সেক্ষেত্রে জামায়াত চেষ্টা করছে একটি আসনে ইসলামি দলগুলোর একজন প্রার্থী থাকবে। আবার বিএনপির তৎপরতা আছে, ২০১৮ সালের স্টাইলে মিত্রদের ‘ধানের শীষ’ প্রতীক নিয়ে ভোটে অংশ নেওয়া। তবে রাজনীতিতে শেষ বলে কিছু নেই জানিয়ে দলগুলোর নেতারা বলেন, এখন যে যার মতো তৎপরতা চালাচ্ছেন। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা হলে অনেক চিত্রই পাল্টে যাবে।
সংবাদটি ভালো লাগলে স্যোশাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন