এশিয়ার প্রাচীনতম বাংলা সংবাদপত্র প্রথম প্রকাশ ১৯৩০

প্রিন্ট রেজি নং- চ ৩২



……………………………

কদম গাছের চূড়ায় আটকে ছিল দুই দিন: সিলেটে অবলা বিড়ালছানা উদ্ধারে রুদ্ধশ্বাস মানবিক অভিযান

Daily Jugabheri
প্রকাশিত time ago 2 hours
কদম গাছের চূড়ায় আটকে ছিল দুই দিন: সিলেটে অবলা বিড়ালছানা উদ্ধারে রুদ্ধশ্বাস মানবিক অভিযান

পাথুরে নগরের ইট-কাঠ-পাথরের ভিড়ে মানুষ যখন ক্রমশ আত্মকেন্দ্রিক হয়ে উঠছে, ঠিক তখনই প্রাণীকুলের প্রতি পরম মমত্ব ও মানবিকতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপিত হলো সিলেটে। বিশাল এক কদম গাছের মগডালে টানা দুই দিন ধরে আটকে থাকা ছোট্ট একটি অবলা বিড়ালছানাকে বাঁচাতে সমন্বিত উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করেছে ফায়ার সার্ভিস ও স্থানীয়রা। দীর্ঘ এক ঘণ্টার শ্বাসরুদ্ধকর ও সুপরিকল্পিত প্রচেষ্টায় অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে প্রাণভয়ে কাঁপতে থাকা ফুটফুটে বিড়ালছানাটিকে।

মঙ্গলবার দিবাগত রাতে সিলেট সিটি করপোরেশনের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের গোয়াইটুলা এলাকার ৬৪/১ নম্বর বাসায় এই চমৎকার মানবিক ঘটনাটি ঘটে। বাড়িটি সিলেট সিটি করপোরেশনের সাবেক কাউন্সিলর জাহানারা খানম মিলনের।

জানা যায়, প্রায় দুই দিন আগে সবার অজান্তে বাড়ির পাশের বিশাল উঁচু কদম গাছে বেয়ে উঠে পড়ে একটি সাদা-ধূসর রঙের বিড়ালছানা। ওঠার সময় অনায়াসে উঠে গেলেও গাছের একেবারে চূড়ায় পৌঁছানোর পর নিচে নামার পথ আর খুঁজে পায়নি সে। চারপাশে সবুজ পাতার গভীর আড়াল আর মাটির বহু ওপরে শূন্যের মাঝে আটকে পড়ে ছোট্ট প্রাণীটি। প্রথমদিকে বিষয়টি কারও নজরে আসেনি। কিন্তু টানা দুই দিন ধরে অভুক্ত ও তৃষ্ণার্ত অবস্থায় তীব্র আতঙ্কে গাছ থেকে একটানা ডেকে যাচ্ছিল ছানাটি। দিনভর আশপাশের লোকজন তার করুণ আর্তনাদ শুনে গাছের নিচে জড়ো হতে থাকে। কিন্তু কদম গাছটি অত্যন্ত দীর্ঘ ও শাখা-প্রশাখা ভঙ্গুর হওয়ায় সাধারণ কারও পক্ষেই অত উঁচুতে উঠে বিড়ালটিকে নামিয়ে আনা সম্ভব ছিল না। সময় যত গড়াচ্ছিল, ক্ষুধার্ত ছানাটির মগডাল থেকে নিচে পড়ে গিয়ে প্রাণ হারানোর শঙ্কা তত তীব্র হচ্ছিল। অবলা প্রাণীটির জীবনের ঝুঁকি বিবেচনায় মানবিক তাড়নায় মাঠে নামেন চ্যানেল আইয়ের সিলেট প্রতিনিধি সাদিকুর রহমান সাকী। গাছটি খুব বেশি উচু হওয়ায় সিলেট ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স স্টেশনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলেন তিনি। একটি অবলা জীবের জীবন রক্ষার্থে সহযোগিতার অনুরোধ করেন। সেই আহবানে সাড়া দিয়ে দ্রুত উদ্ধারকারী দল পাঠায় ফায়ার সার্ভিস।

খবর পাওয়া মাত্রই সিলেট ফায়ার সার্ভিসের কন্ট্রোল রুম থেকে উদ্ধারকারী দলকে দ্রুত ঘটনাস্থলে যাওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়। ফায়ার সার্ভিসের দক্ষ টিম লিডার প্রীতিশ কুমার দাসের নেতৃত্বে ফায়ার ফাইটারদের একটি বিশেষ রেসকিউ টিম প্রয়োজনীয় উদ্ধার সরঞ্জাম নিয়ে দ্রুত গোয়াইটুলার ওই বাসায় এসে পৌঁছায়।
ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি ও সাইরেনের শব্দে মুহূর্তেই গোটা এলাকায় আলোড়ন সৃষ্টি হয়। রাতের আঁধারে গোয়াইটুলার সরু গলিতে শত শত উৎসুক এলাকাবাসী ও শিশুরা ভিড় জমায়। সবার চোখ তখন টর্চলাইটের আলোর বৃত্ত ধরে ওপরের দিকে—কদম গাছের পাতার ফাঁকে আটকে থাকা একরত্তি বিড়ালছানাটির দিকে।
অভিযানের শুরুতেই দেখা দেয় বড় চ্যালেঞ্জ। গাছটি শুধু উঁচুই ছিল না, আশপাশে ছিল টিনের চাল এবং বৈদ্যুতিক তারের জটলা। ঘন পাতার আড়ালে বিড়ালছানাটি এমন এক সরু ডালে বসে কাঁপছিল, যেখানে সরাসরি কারও হাত পৌঁছানো কঠিন ছিল। টিম লিডার প্রীতিশ কুমার দাস অত্যন্ত সতর্কতার সাথে পুরো পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে উদ্ধার কৌশল নির্ধারণ করেন। ফায়ার সার্ভিসের বহনযোগ্য বিশেষ অ্যালুমিনিয়াম এক্সটেনশন মই একে একে জোড়া দিয়ে গাছের মগডাল বরাবর স্থাপন করা হয়। নিচে মইটি শক্ত করে ধরে দাঁড়িয়ে থাকেন ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা ও স্থানীয় যুবকেরা।
এরপর শুরু হয় মূল উদ্ধারকাজ। ফায়ার সার্ভিসের এক সদস্য সতর্কতার সাথে মই বেয়ে তরতর করে ওপরে উঠতে শুরু করেন। নিচে তখন শত শত মানুষের উৎকণ্ঠায় ভরা দৃষ্টি আটকে ছিল ওপরের দিকে। সামান্য একটু অসাবধানতায় ভয় পেয়ে বিড়ালছানাটি লাফ দিলে বা নিচে পড়ে গেলে নিশ্চিত মৃত্যুর আশঙ্কা ছিল। কিন্তু ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধারকারী সদস্য অত্যন্ত ধৈর্য ও পেশাদারিত্বের পরিচয় দেন। তিনি ডালে ডালে আলো ফেলে বিড়ালটিকে অভয় দিয়ে আস্তে আস্তে তার কাছে পৌঁছান। দীর্ঘ প্রায় এক ঘণ্টার চরম সতর্কতা ও কৌশলপূর্ণ প্রচেষ্টার পর অবশেষে তিনি বিড়ালছানাটিকে উদ্ধার করতে সক্ষম হন।
এই সফল ও ব্যতিক্রমী মানবিক অভিযান সম্পর্কে সিলেট সিটি করপোরেশনের সাবেক কাউন্সিলর জাহানারা খানম মিলন বলেন, “গত দুই দিন ধরে বিড়ালছানাটির কান্না শুনে আমাদের মন ভীষণ খারাপ ছিল। আমরা নিচে দাঁড়িয়ে শুধু ছটফট করছিলাম, কিন্তু এত উঁচু গাছে উঠে তাকে বাঁচানোর কোনো উপায় পাচ্ছিলাম না। অবলা জীব, মুখে তো কিছু বলতে পারে না। তখন সাংবাদিক সাকী ফায়ার সার্ভিসের সাথে যোগাযোগ করেন। ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা খবর পেয়ে যেভাবে দ্রুত ছুটে এসেছেন এবং চরম ধৈর্য নিয়ে ছানাটিকে অক্ষত উদ্ধার করেছেন, তাতে আমি অভিভূত। তারা প্রমাণ করলেন মানুষের পাশাপাশি যেকোনো ছোট জীবের জীবনের মূল্যও অনেক বড়। ফায়ার সার্ভিসের প্রতি আমরা কৃতজ্ঞ।
অভিযানের নেতৃত্ব দেওয়া সিলেট ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধারকারী দলের লিডার প্রীতিশ কুমার দাস তাঁর অনুভূতি প্রকাশ করে বলেন, “ফায়ার সার্ভিসের মূল মন্ত্রই হলো মানুষের জানমাল ও জীবনের সুরক্ষা নিশ্চিত করা। তবে সৃষ্টির যেকোনো জীব বিপদে পড়লে তাকে রক্ষা করা আমাদের পরম নৈতিক দায়িত্ব। বিড়ালছানাটি অত্যন্ত উঁচুতে ঝুঁকিপূর্ণ এক সরু ডালে ছিল। একটু ভুল হলেই হয়তো তাকে আর জীবিত পাওয়া যেত না। আমাদের দল দীর্ঘ প্রচেষ্টায় অত্যন্ত নিখুঁতভাবে অভিযান সম্পন্ন করতে পেরেছে। ছানাটিকে অক্ষতভাবে নামিয়ে এনে সবার মুখে যখন অমলিন হাসি দেখেছি, তখন আমাদের সকল ক্লান্তি দূর হয়ে গেছে। প্রতিটি জীবনেরই সমান গুরুত্ব আছে, এই বার্তাটি আমরা সমাজে ছড়িয়ে দিতে চাই।”
গোয়াইটুলার এই ঘটনাটি কেবল একটি সাধারণ উদ্ধারকাজ ছিল না; এটি ছিল সমাজে ছড়িয়ে পড়া এক গভীর ইতিবাচক বার্তা। একটি ছোট্ট বিড়ালছানাকে বাঁচাতে জনপ্রতিনিধি, গণমাধ্যমকর্মী, ফায়ার সার্ভিসের পেশাদার দল এবং সাধারণ মানুষের এমন স্বতঃস্ফূর্ত একাত্মতা প্রমাণ করে—কঠিন এই সময়েও সমাজে সহানুভূতি, ভালোবাসা ও মানবতা এখনো অমলিন। অবলা প্রাণীর জীবন রক্ষায় সিলেটবাসীর এমন মমত্ববোধ নগরজুড়ে ব্যাপক প্রশংসা কুড়াচ্ছে।

সংবাদটি ভালো লাগলে স্যোশাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন
04 November 2026

কদম গাছের চূড়ায় আটকে ছিল দুই দিন: সিলেটে অবলা বিড়ালছানা উদ্ধারে রুদ্ধশ্বাস মানবিক অভিযান

বিস্তারিত কমেন্টে