
আব্দুল আলীম, কোম্পানীগঞ্জ :: সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার ধলাই সেতু সিলেট জেলার দ্বিতীয় দীর্ঘতম সেতু।এ সেতু নির্মাণের ফলে ধলাই’ নদের দু-পারের মানুষের মধ্যে গড়ে উঠে এক ঐতিহাসিক সেতুবন্ধন।কিন্তু এ বন্ধন আর বেশি দিন টিকে থাকবে বলে মনে হচ্ছে না। ব্রীজের নিচ থেকে দিনে রাতে বেপরোয়া বালুও পাথর উত্তোলনের ফলে নেমে আসতে পারে মহা বিপর্যয়। আশঙ্কা দেখা দিয়েছে ব্রিজটি ধ্বসে পড়ার।
গত কয়েকমাস থেকে ধলাই ব্রীজের নিচে বালুখেকোরা চালিয়ে যাচ্ছে মহা তান্ডব। ইতিমধ্যে ব্রীজের সবকটি পায়ার কাছেই সৃষ্টি করা হয়েছে বড় বড় গভীর গর্ত। পাশেই কালাসাদেক বিজিবি ক্যাম্প। বিজিবি ক্যাম্পের ২০০ ফুটের নিকট হতে বালু উত্তোলন করলে ও কোন ব্যবস্থা নিচ্ছেনা বিজিবি। মাঝেমধ্যে,পুলিশ আইওয়াশ অভিযান চালালেও বন্ধ করা যাচ্ছে না বালুখেকোদের তান্ডব। ফলে আবারো বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তে পারেন ধলাই নদীর দুইপারের মানুষের চলাচল । বিশেষ করে চরম দুর্ভোগে পড়তে পারেন ধলাইর পূর্বপারের বাসিন্দারা। সেতু ভেঙে পড়লে আবারো সেই পূরনো আমলের খেয়া- পারাপারের ঝামেলায় পড়তে পারেন প্রায় অর্ধলক্ষ মানুষ। ক্ষতির মূখে পড়তে পারে কয়েক শতাধিক ক্রাশার মিল ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ।
এ প্রসঙ্গে ধলাই পূর্বপারের বাসিন্দা কলাবাড়ী গ্রামের সরকারী চাকুরীজীবি এনায়েতুল ইসলাম সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লিখেন, ধলাই ব্রিজের নিচ থেকে বালু ও পাথর উত্তোলন বন্ধ না করলে ব্রিজটি ধ্বংস হয়ে যাবে। আমাদের জন্য চরম দূর্ভোগ অপেক্ষা করছে। তাই এলাকাবাসীকে এখনই সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।
ভোলাগঞ্জ গ্রামের পাথর ব্যবসায়ী জসিমুল ইসলাম আঙ্গুর সোস্যাল মিডিয়ায় এক স্ট্যাটাস দেন। তিনি বলেন- এভাবেই চলছে “ধলাই ব্রিজের নিচ থেকে বালু ও পাথর উত্তোলন। ব্রিজের আশেপাশের বালুর খরিদঘাটগুলো বন্ধ করা না গেলে বন্ধ হবেনা ব্রিজের নিচ থেকে বালু, পাঘর উত্তোলন। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান,
পশ্চিমপাড়ের মানুষের সাথে পুর্বপাড়বাসী সেই সনাতন আমলের মতো আতুড় হয়ে যাব। কষ্ট আমাদের প্রত্যেকেরই হবে। আমাদের মুমূর্ষু রোগী, গর্ভবতী নারী, সাধারণ শ্রমিক,চাকুরিজীবী, আমলা, কামলা, শিশু-কিশোরসহ সব ধরনের মানুষকে খেয়া পারাপারের ঝামেলায় পড়তে হবে। শুধু এটা না, তখন এই ব্রিজের দোহাই দিয়ে মুদি ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে সবজি ব্যবসায়ী, মাছ ব্যবসায়ী, তেল ব্যবসায়ী, পান ব্যবসায়ীসহ সব ধরনের ব্যবসায়ীই আমাদের গলা কাটবে। ক্ষমতাশালীরা এখন যেরকম দামি দামি মোটর চড়ে ব্রিজ লুটপাটে মেতে আছেন; তখন কিন্তু ধনী-গরিব কারো কোনো ভেদাভেদ থাকবে না। সবাইকে লুঙ্গি মাথায় দিয়ে অথবা সাঁতার কেটে জেলা-উপজেলায় যেতে হবে। সেদিন আপনার দামি গাড়িটা ওপারেই থাকবে, আর এ পারে আনতে পারবেন না!
তাই সেতুটির ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন ধলাই নদীর পূর্বপারের সর্বস্তরের মানুষ।
এলাকার সচেতন নাগরিক আহমেদ নুর নামের আরেকজন যুবক বলেন, আমরা মানববন্ধন করেছি। সরকারের প্রতিটি দপ্তরে গিয়েে সমস্যার কথা জানিয়েছি ।কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি। এখন ও ‘ধলাই সেতুর গোড়া থেকে বালু উত্তোলন চলছেই। বালু কারবারীরা বেপরোয়া। কারও তোয়াক্কা তারা করে না। নির্বিঘ্নে চলছে সব। প্রশাসন এখানে নির্বিকার। মাঝেমাঝে অভিযান হয়। অভিযান শেষ হওয়ার সাথে সাথে ফের শুরু হয় বালু পাথর উত্তোলন ।
সরেজমিন ঘুরে গিয়ে দেখা যায়, সেতুর গোঁড়া থেকে অবাধে বালু উত্তোলন চলছে। শতাধিক বারকি নৌকায় লোড করা হয় বালু। পরে সেগুলো ট্রাক্টরে করে নদীর পাড়ে স্তূপ করে রাখা হয়। সেখান থেকে বড় হাইড্রলিক্স ট্রাকে করে ধোপাগোলসহ দেশের বিভিন্ন যায়গায় বিক্রি করা হয় । সেতুর গোঁড়ার নিচ থেকে বালু উত্তোলনের ফলে ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে সেতুটি। ইতিমধ্যে সেতুর পিলার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পিলারের গোঁড়া থেকে মাটি সরে গিয়ে বড় বড় গর্ত তৈরি হয়েছে।
স্থানীয়রা জানান গত বছরের ৫ জুলাইয়ের পর থেকে এ তান্ডব শুরু হয়েছে। তবে ৩/৪ মাস থেকে এই অবৈধ কারবার মারাত্বক আকারে বৃদ্ধি পেয়েছে। । স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশের পক্ষ থেকে অভিযান চালিয়েও বালু কারবারীদের দৌরাত্ম্য বন্ধ করা যাচ্ছে না। এলাকাবাসীর দাবী, নদীর পাশে স্তুপ আকারে জমা রাখা বালু ও পাথর জব্দ করে মূল হোতাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে এটা বন্ধ করা কোনভাবেই সম্ভব হবেনা । আর দ্রুত এ উদ্যোগ গ্রহন না করলে হুমকির মধ্যে পড়তে পারে সিলেটের দ্বিতীয় দীর্ঘতম এ সেতুটি ।কোম্পানীগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ( ওসি) উজায়ের আল মাহমুদ আদনান জানান, ধলাই সেতুর নিচ থেকে বালু ও পাথর উত্তোলনের সাথে জড়িতদের বিরোদ্ধে এর আগে ও একাধিক মামলা হয়েছে। এ ব্যাপারে খুবই কঠোর এখানে কোন ছাড় নয়। এ অবৈধ কারবারের সাথে যারাই জড়িত থাকবে তদন্ত করে তাদের বিরোদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে।
কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মিজ আজিজুন্নাহার জানান, ধলাই সেতু একটি রাষ্ট্রেিয় সম্পদ। সরকারি স্থাপনা ধ্বংস করে বালু, পাথর উত্তোলনকারীদের বিরোদ্ধে আমাদের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। এর সাথে যারা জড়িত তাদের বিরোদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে।
উল্লেখ্য যে, ৪৩৪ দশমিক ৩৫ মিটার দীর্ঘ ও ৯ দশমিক ৫ মিটার প্রস্থ এই সেতুটি সিলেট জেলার দ্বিতীয় দীর্ঘতম সেতু । ধলাই নদের পূর্ব ও পশ্চিম এই দূপারের মানুষের যাতায়াতের জন্য তৎকালীন অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী এম সাইফুর রহমানের বদৌলতে ২০০৩ সালে সেতুটির নির্মাণ কাজ শুরু হয়। ২০০৬ সালের সেপ্টেম্বরে মানুষের চলাচলের জন্য সেতুটি উম্মুক্ত করে দেয়া হয়। ধলাই সেতু নির্মিত হওয়ায় কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার পূর্ব ইসলামপূর, উত্তর রণীখাই ইউনিয়নের অর্ধশতাধিক গ্রামের মানুষ সরাসরি সড়ক যোগাযোগের আওতায় আসে।
সংবাদটি ভালো লাগলে স্যোশাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন