
যুগভেরী ডেস্ক ::: বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম বিদেশ সফরে যাচ্ছেন তারেক রহমান। রোববার (২১ জুন) দুই দেশ মিলিয়ে মোট ছয় দিনের সফরে ঢাকা ত্যাগ করবেন তিনি। সফরের প্রথমাংশে মালয়েশিয়া সফর শেষে তিনি চীনের উদ্দেশ্যে রওনা হবেন।
আগামী ২৩ থেকে ২৬ জুন প্রধানমন্ত্রী চীনে অবস্থান করবেন। দুই দেশে প্রধানমন্ত্রীর এই সফরকে কূটনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে মালয়েশিয়ার সফর থেকে বাংলাদেশের শ্রমবাজার নিয়ে বড় কোনো সুখবর আসতে পারে বলে ধারণা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের আমন্ত্রণে কুয়ালালামপুর সফর করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সফরে দুই দেশের মধ্যে দুটি সমঝোতা স্মারক ও দুটি ‘নোট অব এক্সচেঞ্জ’ সই হতে পারে। রোববারই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে বসবেন। দুই দেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় ছাড়াও বাণিজ্য নিয়ে আলোচনা হবে, যার মধ্যে অন্যতম আলোচনার বিষয় হিসেবে থাকবে হালাল পণ্য রফতানি।
মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশ হাইকমিশনের এক কর্মকর্তা জানান, ‘বৈঠকে মূল আলোচনায় থাকবে শ্রমবাজার। নানা কারণে আমাদের এই গুরুত্বপূর্ণ শ্রমবাজারটি স্থবির হয়ে আছে। এই বৈঠক থেকে শ্রমবাজার সচল করার বিষয়ে একটা গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত আসতে পারে।’ এর আগে ২০২৫ সালের আগস্টে তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মোহাম্মদ ইউনূস মালয়েশিয়া সফর করেছিলেন। সে সময় বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে পাঁচটি সমঝোতা স্মারক এবং তিনটি ‘নোট অব এক্সচেঞ্জ’ স্বাক্ষরিত হয়েছিল।
দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকা মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার প্রধানমন্ত্রীর এই সফরের মধ্য দিয়ে পুনরায় চালুর বিষয়ে বড় সুযোগ তৈরি হবে বলে আশা করছেন প্রবাসীরা। প্রবাসী কমিউনিটি নেতা ও মালয়েশিয়া বিএনপির সহ-সাধারণ সম্পাদক কাজী সালাহউদ্দিন বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই সফর কেবল কূটনৈতিক আনুষ্ঠানিকতা নয়; বরং মালয়েশিয়ায় বসবাসরত লাখো বাংলাদেশির দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা পূরণের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। প্রবাসীদের বিশ্বাস— শ্রমবাজার সম্প্রসারণ, সিন্ডিকেটমুক্ত কর্মী নিয়োগ, অনিয়মিত কর্মীদের বৈধতা এবং প্রবাসীবান্ধব নীতিমালার মাধ্যমে সফরটি দুই দেশের সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে।
বর্তমানে মালয়েশিয়ায় উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বাংলাদেশি বিভিন্ন কারণে অনিয়মিত অবস্থায় রয়েছেন। কেউ নিয়োগকর্তার প্রতারণার শিকার হয়েছেন, আবার কেউ কর্মসংস্থানের সংকটে বৈধ অবস্থান হারিয়েছেন। কুয়ালালামপুরে বসবাসরত এক শ্রমিক বলেন, ‘বৈধ হওয়ার সুযোগ পেলে আমরা আরও বেশি আয় করতে পারবো এবং দেশে বেশি রেমিট্যান্স পাঠাতে পারবো। সফরে এ বিষয়ে ইতিবাচক আলোচনা হলে হাজারো পরিবার উপকৃত হবে।’ প্রবাসীদের আশা, দুই দেশের উচ্চ পর্যায়ের আলোচনার মাধ্যমে নতুন কোনো বৈধকরণ কর্মসূচি চালু হলে তা অনিয়মিত কর্মীদের জন্য বড় স্বস্তি বয়ে আনবে।
অন্যদিকে, ব্যবসায়ীরা আশা করছে, সফরের মাধ্যমে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগে নতুন গতি আসবে। হালাল শিল্প, প্রযুক্তি, কৃষি ও উৎপাদন খাতে যৌথ উদ্যোগ বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।
মালয়েশিয়া সফর শেষ করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চীনের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হবেন। সফরের মূল লক্ষ্য হবে চীনা বিনিয়োগ আকর্ষণ, উন্নয়ন সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং বাণিজ্য সম্প্রসারণ।
চীন বর্তমানে বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ বাণিজ্য অংশীদার। প্রতিবছর বাংলাদেশ প্রায় ২৫ বিলিয়ন ডলারের পণ্য চীন থেকে আমদানি করে। পাশাপাশি অবকাঠামো উন্নয়নেও দেশটি বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান উন্নয়ন সহযোগী। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াংয়ের বৈঠক শেষে দুই দেশের মধ্যে একটি যৌথ ইশতেহার ঘোষণার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ ও চীনের কূটনৈতিক সম্পর্কের পাঁচ দশক পূর্তির পর এটি হবে তৃতীয় যৌথ ইশতেহার। একই সঙ্গে চীনের বৈশ্বিক উন্নয়ন উদ্যোগ (জিডিআই)-এ বাংলাদেশের আনুষ্ঠানিক অংশগ্রহণের ঘোষণাও আসতে পারে। চীন সফরে বেল্ট অ্যান্ড রোড সহযোগিতা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি, জ্বালানি উন্নয়ন, মানবসম্পদ উন্নয়ন, বৃত্তিমূলক শিক্ষা, উন্নয়ন সহযোগিতা, মোংলা বন্দরের সম্প্রসারণ, উচ্চমানের বাংলাদেশি পণ্য রপ্তানি বৃদ্ধি এবং তাজা কাঁঠাল রপ্তানি নিয়ে একাধিক সমঝোতা স্মারক সই হওয়ার কথা রয়েছে।
এছাড়া বিএনপি এবং চীনের কমিউনিস্ট পার্টির মধ্যেও একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পরিকল্পনা রয়েছে। তথ্য ও সম্প্রচার খাতেও সহযোগিতা বাড়াতে চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা শিনহুয়া, চায়না মিডিয়া গ্রুপ, বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস) এবং বাংলাদেশ টেলিভিশনের মধ্যে কয়েকটি সমঝোতা স্মারক সই হবে।
চীন সফরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হবে দেশটির প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বৈঠক। এছাড়া প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াং, ন্যাশনাল পিপলস কংগ্রেসের চেয়ারম্যান ঝাও লেজিসহ চীনের শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে পৃথক বৈঠক করবেন তিনি। সফরকালে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের ‘সামার দাভোস’-এ অংশ নেওয়ার পাশাপাশি বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট ফোরামে চীনা বিনিয়োগকারীদের সামনে বাংলাদেশের সম্ভাবনা তুলে ধরবেন প্রধানমন্ত্রী।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, মালয়েশিয়া ও চীন সফরের মাধ্যমে বাংলাদেশ একদিকে অর্থনৈতিক স্বার্থ এগিয়ে নিতে চাচ্ছে, অন্যদিকে বৈশ্বিক শক্তিগুলোর মধ্যে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখার বার্তাও দিচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সফরের মাধ্যমে এমন কোনো ধারণা তৈরি হওয়া উচিত নয় যে বাংলাদেশ কোনো একটি বৃহৎ শক্তির ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। বরং আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শক্তিগুলোর সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখেই জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
সংবাদটি ভালো লাগলে স্যোশাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন