এশিয়ার প্রাচীনতম বাংলা সংবাদপত্র প্রথম প্রকাশ ১৯৩০

প্রিন্ট রেজি নং- চ ৩২



……………………………

জাফলংয়ে প্রকৃতি আছে, পর্যটন ব্যবস্থাপনা কোথায়?

Daily Jugabheri
প্রকাশিত time ago 49 minutes
জাফলংয়ে প্রকৃতি আছে, পর্যটন ব্যবস্থাপনা কোথায়?

মহাপরিকল্পনা ফাইলেই, মাঠে অবকাঠামোর সংকট

মনসুর আলম, গোয়াইনঘাট ::: পাহাড়, স্বচ্ছ পানির পিয়াইন নদী, ঝরনা, পাথুরে ভূপ্রকৃতি, চা-বাগান আর ভারতের মেঘালয় রাজ্যের পাহাড়ঘেরা সীমান্ত-প্রকৃতির এমন বৈচিত্র্য একসঙ্গে খুব কম জায়গাতেই দেখা যায়। সেই সৌন্দর্যই জাফলংকে কয়েক দশক ধরে দেশের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্রে পরিণত করেছে। কিন্তু পর্যটকের আকর্ষণ বাড়লেও সেই তুলনায় বাড়েনি পর্যটন অবকাঠামো ও ব্যবস্থাপনা। সরকারি পরিকল্পনা হয়েছে, মহাপরিকল্পনা হয়েছে, কর্মকর্তারা একাধিকবার উন্নয়নের আশ্বাস দিয়েছেন; কিন্তু ২০২৬ সালে এসেও মাঠের চিত্রে বড় ধরনের পরিবর্তনের ছাপ নেই।

সরেজমিন অনুসন্ধানে দেখা গেছে, জাফলংয়ের প্রধান পর্যটন স্পটগুলোতে রয়েছে অপরিকল্পিত দোকানপাট, পর্যাপ্ত ডাস্টবিনের অভাব, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা, অপর্যাপ্ত পার্কিং, বিশ্রামের জায়গার সংকট, মানসম্মত টয়লেটের অভাব, বিশুদ্ধ পানির সংকট এবং পর্যটকদের নিরাপত্তায় সীমাবদ্ধতা। বিশেষ দিনে বিপুলসংখ্যক পর্যটকের চাপ সামলানোর মতো কোনো বৈজ্ঞানিক ধারণক্ষমতা নির্ধারণ বা পর্যাপ্ত অবকাঠামোও নেই।

অথচ বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের বিদ্যমান পর্যটন মহাপরিকল্পনায় জাফলংকে গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন গন্তব্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। সরকারি মহাপরিকল্পনায় জাফলংয়ের সম্ভাব্য পর্যটন ভাবনা হিসেবে নদীকেন্দ্রিক পর্যটনকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

নব্বইয়ের দশক থেকে বাড়তে থাকে পর্যটকের আনাগোনা

স্থানীয় প্রবীণদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, স্বাধীনতার পরপরই সিলেট ও আশপাশের এলাকার মানুষের জাফলংয়ে আসা-যাওয়া শুরু হয়। ৮৭ বছর বয়সী স্থানীয় বাসিন্দা নূরমোহাম্মদ জানান, স্বাধীনতার পরের সময়েই আশপাশের মানুষ জাফলংয়ে বেড়াতে আসতেন। তখন তিনি কখনো কামরাঙ্গা, কখনো নিজের জমির উৎপাদিত শসা বিক্রি করতেন পর্যটকদের কাছে।

জাফলং টুরিস্ট ক্লাবের সভাপতি ও বল্লাঘাট পর্যটন কেন্দ্র ব্যবসায়ী কমিটির সাবেক সাধারণ সম্পাদক লোকমান মিয়ার ভাষ্য, নব্বইয়ের দশকের পর জাফলংয়ের পরিচিতি দ্রুত বাড়তে থাকে। এরপর ২০০০ সালের পর পর্যটকের সংখ্যা আরও বাড়ে। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের মতে, পাহাড়, নদী, পাথর, ঝরনা, সীমান্তের অপরূপ দৃশ্য এবং গণমাধ্যমে জাফলংয়ের প্রচার পর্যটক বৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা রেখেছে।

স্থানীয় ব্যবসায়ী হোসেন মিয়া বলেন, একসময় মানুষ দলবেঁধে গাড়ি নিয়ে জাফলং আসতেন। সঙ্গে রান্নার সরঞ্জাম ও বাবুর্চি থাকত। দর্শনীয় স্থান ঘুরে সন্ধ্যার আগেই অনেকে সিলেট শহরে ফিরে যেতেন। পরে সড়ক যোগাযোগের উন্নয়ন, গণমাধ্যমে প্রচার এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রসারে পর্যটকের সংখ্যা ব্যাপকভাবে বেড়ে যায়।

অর্থাৎ জাফলংয়ের পর্যটন বিকাশ মূলত প্রকৃতি ও মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত আকর্ষণকে কেন্দ্র করে হয়েছে; এর সঙ্গে সমান্তরালে কোনো পূর্ণাঙ্গ পর্যটন ব্যবস্থাপনা গড়ে ওঠেনি-মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধানে এমন চিত্রই পাওয়া গেছে।

সৌন্দর্যের সঙ্গে অব্যবস্থাপনার সহাবস্থান

মঙ্গলবার ২৪ আগস্ট সরেজমিনে জাফলং ঘুরে দেখা যায়, পুরোনো প্রধান প্রবেশপথ বল্লাঘাট পিকনিক সেন্টারে পর্যটকের উপস্থিতি তুলনামূলক কম। জেলা পরিষদের ডাকবাংলোসহ পুরোনো কিছু স্থাপনা থাকলেও সেগুলো পর্যটকদের কাছে নতুন আকর্ষণ তৈরি করতে পারেনি।

অন্যদিকে দ্বিতীয় প্রবেশপথ বিজিবি ক্যাম্পসংলগ্ন এলাকা দিয়ে পর্যটকদের চাপ বেশি। কিন্তু সেখানে সরকারি পার্কিং ব্যবস্থা না থাকায় যানবাহন সড়কের পাশে ও আশপাশে দাঁড় করানো হচ্ছে। এতে ছুটির দিনে যানজট তৈরি হচ্ছে।

জাফলং জিরো পয়েন্টের প্রবেশমুখে দেখা গেছে দোকানপাটের আশপাশ ও বিজিবি ক্যাম্প লালমাটি এলাকায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা ময়লা-আবর্জনা। নদীর কাছাকাছি এসব বর্জ্য পরিবেশের জন্যও উদ্বেগ তৈরি করছে। বিশেষ করে ক্যাম্পের লালমাটি এলাকার বর্জ্যের স্তূপ থেকে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। পর্যটকদের অভিযোগ, এলোমেলো দোকানপাট ও চেঞ্জিং রুমের কারণে জিরো পয়েন্টের মূল প্রাকৃতিক দৃশ্য অনেক সময় ঠিকমতো দেখা বা ক্যামেরাবন্দি করা যায় না।

তবে জাফলংয়ের প্রকৃত আকর্ষণ এখনো অটুট। স্বচ্ছ পানিতে পর্যটকদের আনন্দ করতে দেখা গেছে। সবচেয়ে বেশি ভিড় ছিল ঝরনা এলাকায়। কেউ পানিতে নেমে আনন্দ করছেন, কেউ ছবি তুলছেন। আবার অনেকে সতর্কতামূলক নির্দেশনা উপেক্ষা করে ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে উঠতে দেখা গেছে।

টয়লেট আছে, ব্যবহারযোগ্যতা প্রশ্নে

পর্যটকদের অন্যতম বড় অভিযোগ টয়লেট নিয়ে। উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে নির্মিত কিছু টয়লেট থাকলেও সেগুলোর ব্যবহার সীমিত বলে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে। বেসরকারি বাণিজ্যিক টয়লেটগুলো নিয়েও রয়েছে পরিচ্ছন্নতা ও মান নিয়ে অভিযোগ।

বিশ্রামাগার বা পর্যাপ্ত বসার জায়গার অভাবও প্রকট। শিশু, নারী ও বয়স্ক পর্যটকদের জন্য দীর্ঘ সময় অবস্থানের উপযোগী বসার ব্যবস্থা নেই। গরমের মধ্যে বিজিবি ক্যাম্পসংলগ্ন সরু সিঁড়ি দিয়ে বিপুলসংখ্যক পর্যটককে ওঠানামা করতে দেখা যায়।

পাথর জাদুঘরই যেন পরিকল্পনার প্রতীক

জাফলংয়ের পর্যটন ব্যবস্থাপনায় পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের ফারাকের একটি দৃশ্যমান উদাহরণ হয়ে উঠেছে পাথর জাদুঘর। বিপুল অর্থ ব্যয়ে নির্মিত এই স্থাপনাটি জাফলংয়ের ভূতাত্ত্বিক ঐতিহ্য তুলে ধরার গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন সম্পদ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু মাঠপর্যায়ে এর রক্ষণাবেক্ষণ নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, উদ্বোধনের পর কিছুদিন কার্যক্রম থাকলেও বর্তমানে স্থাপনাটি অনেকটাই অরক্ষিত। চারপাশে ঝোপঝাড়, ভাঙা কাচ ও অযত্নের চিত্র দেখা যায়। নিরাপত্তা ও নিয়মিত ব্যবস্থাপনার ঘাটতিতে এটি পর্যটন সম্পদ হিসেবে ব্যবহারের বদলে পরিত্যক্ত স্থাপনার রূপ নিচ্ছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।

বাংলাদেশ ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদপ্তরের নিজস্ব তথ্য অনুযায়ী, ভূতাত্ত্বিক নমুনা সংরক্ষণ ও দর্শনার্থীদের ভূতত্ত্ব সম্পর্কে ধারণা দেওয়ার জন্য জাদুঘর কার্যক্রম গুরুত্বপূর্ণ।

জাফলংয়ে ভূতাত্ত্বিক ঐতিহ্য সংরক্ষণে আঞ্চলিক অফিস, জাদুঘর, গবেষণাগার ও প্রশিক্ষণকেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছিল বলে মাঠ-নোটে উঠে এসেছে। কিন্তু সংশ্লিষ্ট অবকাঠামোর বাস্তব ব্যবহার ও রক্ষণাবেক্ষণ নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।

পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকায় বর্জ্যের স্তূপ

জাফলং পরিবেশগতভাবে সংবেদনশীল এলাকা। অথচ পর্যটনের চাপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরেজমিনে পর্যাপ্ত ডাস্টবিনের ঘাটতি এবং নদীর তীর ও দোকানপাটের আশপাশে বর্জ্য পড়ে থাকার চিত্র দেখা গেছে।

সিলেট পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক আবুল কালাম আজাদ বলেন, জাফলং পরিবেশগতভাবে সংবেদনশীল ও সংরক্ষিত এলাকা। পর্যটন এলাকায় ময়লা-আবর্জনার স্তূপ থাকা দুঃখজনক। বিষয়টি স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পর্যটন বোর্ডের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে পরিবেশগত বিষয়গুলো বাস্তবায়নেও কাজ করা হচ্ছে বলে জানান তিনি।

২০১৫ সালে জাফলংসহ প্রায় ১৪ দশমিক ৯৩ বর্গকিলোমিটার এলাকা পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণা করার পর পরিবেশ সংরক্ষণকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলা হলেও মাঠপর্যায়ের বাস্তবতায় পর্যটন ব্যবস্থাপনার সঙ্গে পরিবেশ সুরক্ষার সমন্বয় এখনো দুর্বল বলে প্রতীয়মান হয়েছে।

পরিকল্পনার পর পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন কোথায়?

বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের ওয়েবসাইটে বাংলাদেশ পর্যটন মহাপরিকল্পনা প্রকাশিত রয়েছে। বোর্ডের ঘোষিত লক্ষ্যও সুপরিকল্পিত ও টেকসই উন্নয়নের মাধ্যমে বিশ্বমানের পর্যটন পণ্য ও সেবা গড়ে তোলা।

জাফলংকে ঘিরে পর্যটন উন্নয়নের বিভিন্ন প্রস্তাবের মধ্যে পরিবেশবান্ধব পর্যটন অবকাঠামো, আধুনিক টয়লেট, বসার স্থান, বর্জ্য রাখার পাত্র, বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা, নির্দেশনামূলক সাইনবোর্ড, হাঁটার পথ ও দর্শনীয় স্থান উন্নয়নের কথা রয়েছে।

কিন্তু অনুসন্ধানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এখানেই-পরিকল্পনার সঙ্গে মাঠের বাস্তবতার মিল কতটুকু?

মঙ্গলবার ২৪ আগস্টের সরেজমিনে এসব সুবিধার উল্লেখযোগ্য বাস্তবায়ন চোখে পড়েনি। বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের পরিচালক (প্রশাসন ও অর্থ) আবু সেলিম মাহমুদ-উল হাসান জানান, বোর্ডের খসড়া মহাপরিকল্পনা পর্যটন মন্ত্রণালয়ে দেওয়া হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের যাচাই-বাছাইয়ের পর আন্তঃমন্ত্রণালয় পত্র বা দাপ্তরিক স্মারক পাওয়া গেছে। চূড়ান্ত প্রতিবেদন মন্ত্রণালয়ে দেওয়ার পর অর্থ বরাদ্দ পাওয়া যাবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
ট্যুরিজম বোর্ডের পর্যটন বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রকৃতি নিজ গুণেই জাফলংকে পর্যটনকেন্দ্রে পরিণত করেছে। এখন সেই সম্ভাবনাকে পরিকল্পিত, নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব পর্যটনে রূপ দেওয়ার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের। পরিকল্পনার কাগজ থেকে বাস্তবের জাফলংয়ে তার প্রতিফলন ঘটানোই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রকৃতি পর্যটন, নদীকেন্দ্রিক ভ্রমণ, সীমান্ত পর্যটন, আলোকচিত্র, ঝরনা, স্থানীয় সংস্কৃতি ও খাসিয়া জনগোষ্ঠীর জীবনধারাকে কেন্দ্র করে জাফলংয়ে বৈচিত্র্যময় পর্যটন গড়ে তোলার সুযোগ রয়েছে। তবে এর জন্য শুধু নতুন স্থাপনা নির্মাণ যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, বিশুদ্ধ পানি, মানসম্মত টয়লেট, পার্কিং, নিরাপত্তা, বসার স্থান ও স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা।
অর্থাৎ পরিকল্পনা তৈরির পর্যায় অতিক্রম করলেও অর্থায়ন ও বাস্তবায়নের পর্যায়ে এখনো বড় অগ্রগতি হয়নি-কর্মকর্তার বক্তব্য এবং মাঠপর্যায়ের চিত্রে এমনই প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে।

প্রশাসনের উদ্যোগ, কিন্তু দৃশ্যমান ফল কতটা?

গোয়াইনঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রতন কুমার অধিকারী জানান, পর্যটন বোর্ডের খসড়া পরিকল্পনাটি তিনি পর্যালোচনা করবেন। জাফলংয়ে ময়লা-আবর্জনা ও এলোমেলো দোকানপাটের বিষয়েও প্রশাসন কাজ করছে। পর্যটনকেন্দ্রকে ময়লা ও দুর্গন্ধমুক্ত করতে বর্জ্য ফেলার নির্দিষ্ট স্থান বা ব্যবস্থাপনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

তিনি আরও জানান, জিরো পয়েন্টকে দৃষ্টিনন্দন করতে ছবি প্রদর্শনীর স্থানসহ কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সবকিছু ঠিক থাকলে এগুলো দ্রুত বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

প্রশাসনের এসব উদ্যোগ আশাব্যঞ্জক হলেও অনুসন্ধানের প্রশ্ন হচ্ছে-পরিকল্পনা ও উদ্যোগের তালিকা দীর্ঘ হওয়ার পরও পর্যটকের মৌলিক চাহিদা বিশুদ্ধ পানি, পরিচ্ছন্ন টয়লেট, বসার স্থান, পার্কিং ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কেন এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত হয়নি?

নিরাপত্তায় জনবল সংকট

পর্যটকদের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা জাফলং পর্যটন অঞ্চলের ইনচার্জ ওসি তপন তালুকদার বলেন, কিছু কিছু স্থানে পর্যটকদের নির্দেশনা দেওয়া হলেও অনেকে তা অমান্য করে শৃঙ্খলা ভঙ্গ করেন। সাপ্তাহিক ছুটির দুই দিনে পর্যটকের সংখ্যা বাড়ে। অন্য সময়ও বিপুলসংখ্যক পর্যটক জাফলংয়ে আসেন। পর্যটকের সংখ্যা বেড়ে গেলে সীমিত জনবল দিয়ে চাপ সামলানো কঠিন হয়ে পড়ে।

বিদেশি পর্যটকদের বিষয়ে তিনি বলেন, মাঝেমধ্যে বিদেশি পর্যটকরাও জাফলংয়ে আসেন। তারা এলে ভাষাগত সহযোগিতার প্রয়োজন হলে বাহিনীর কর্মকর্তাদের মাধ্যমে তাদের সহযোগিতা করা হয়।
ওসি তপন তালুকদারের বক্তব্যে জাফলংয়ের পর্যটন ব্যবস্থাপনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সীমাবদ্ধতা সামনে এসেছে। পর্যটকের সংখ্যা বাড়লেও সেই অনুপাতে নিরাপত্তা ব্যবস্থার জনবল ও সহায়ক অবকাঠামো বাড়েনি। ফলে বিশেষ দিনে বিপুলসংখ্যক পর্যটকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সংশ্লিষ্টদের জন্য বাড়তি চাপ তৈরি করছে।

পর্যটকের সংখ্যা বাড়ছে, ধারণক্ষমতার হিসাব নেই

স্থানীয় ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্টদের হিসাবে সাধারণ দিনে জাফলংয়ে প্রায় দশ হাজার পর্যটক আসেন। ছুটির দিন ও বিশেষ উৎসবে এই সংখ্যা কয়েক গুণ বেড়ে লাখের কাছাকাছি বা তারও বেশি হতে পারে বলে স্থানীয়দের দাবি।

তবে এই সংখ্যা সরকারি পর্যটক-পরিসংখ্যান নয়; মাঠপর্যায়ের স্থানীয় হিসাব হিসেবে এটি বিবেচনা করা জরুরি।

আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, জাফলংয়ের পর্যটক ধারণক্ষমতা নির্ধারণে বৈজ্ঞানিক সমীক্ষার তথ্য পাওয়া যায়নি। অর্থাৎ দিনে কতজন পর্যটক এলে পরিবেশ, নদী, রাস্তা, টয়লেট, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়বে-তার বৈজ্ঞানিক সীমা নির্ধারিত না থাকলে ভবিষ্যৎ পর্যটন ব্যবস্থাপনা অনেকটাই অনুমাননির্ভর থেকে যাবে।

স্থানীয় অর্থনীতির বড় ভরসা পর্যটন

জাফলংয়ে পর্যটনকে ঘিরে সরাসরি ও পরোক্ষভাবে বহু মানুষের জীবিকা তৈরি হয়েছে। খাবারের দোকান, চা-পান, পরিবহন, নৌকা, পর্যটন গাইড, হোটেল-রিসোর্ট, পাথরের তৈরি স্মারক সামগ্রীসহ নানা ব্যবসা পর্যটকদের ওপর নির্ভরশীল।

বৃহত্তর জাফলং পর্যটন ব্যবসায়ী কমিটির সাধারণ সম্পাদক আলমগীর হোসেন বলেন, একসময় পর্যটন ব্যবসায় যুক্ত মানুষের সংখ্যা ছিল ১০-১৫০ জনের মতো। বর্তমানে তাঁর সংগঠনের সঙ্গে প্রায় দেড় হাজার সদস্য যুক্ত। সাপ্তাহিক ছুটি ও বিশেষ দিনে পর্যটক বাড়লে ব্যবসায়ীদের আয় ভালো হয়; অন্য সময় টিকে থাকাই কঠিন।

পানি ব্যবস্থাপনার সমস্যার কথাও তিনি উল্লেখ করেন। একাধিকবার কর্তৃপক্ষকে জানানো হলেও কার্যকর সমাধান হয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি।

জাফলং টুরিস্ট ক্লাবের সভাপতি লোকমান মিয়ার বক্তব্যও তাৎপর্যপূর্ণ। তাঁর মতে, বিভিন্ন সময়ে মন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা জাফলং পরিদর্শনে এসে পর্যটন উন্নয়নের আশ্বাস দিয়েছেন। কিন্তু মাঠে বড় কোনো পরিকল্পনার দৃশ্যমান বাস্তবায়ন হয়নি।

পাথর-বালি উত্তোলন বন্ধ, পর্যটনে নতুন কর্মসংস্থানের আশা

স্থানীয় পর্যায়ে পর্যটন বিকাশের সঙ্গে কর্মসংস্থানের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। পূর্ব জাফলং ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম বলেন, যুগের পর যুগ জাফলং দেশি-বিদেশি পর্যটকদের আকর্ষণ করে আসছে। এই সম্ভাবনা বিবেচনায় নিয়ে জাফলংকে সরকারি মহাপরিকল্পনার আওতায় আনা প্রয়োজন।

তিনি বলেন, এখানকার অনেক মানুষের জীবন-জীবিকার প্রধান উৎস ছিল পাথর ও বালি উত্তোলন। আইনি নিষেধাজ্ঞার কারণে দীর্ঘদিন ধরে এসব কার্যক্রম বন্ধ থাকায় স্থানীয় অনেক মানুষ বিকল্প পেশার দিকে ঝুঁকছেন। পর্যায়ক্রমে অসংখ্য মানুষ পর্যটন ব্যবসায় আগ্রহী হয়ে উঠছেন। স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থানের বিষয়টি বিবেচনা করেও জাফলংকে মহাপরিকল্পনার আওতায় নিয়ে পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার প্রয়োজন রয়েছে বলে তিনি মনে করেন।

বিদেশি পর্যটকের জন্য এখনো প্রস্তুত নয়

প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের দিক থেকে আন্তর্জাতিক পর্যটকের জন্য জাফলংয়ের সম্ভাবনা বড়। পর্যটন অঞ্চলের কর্মকর্তার বক্তব্যেও মাঝেমধ্যে বিদেশি পর্যটকের আগমনের বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক পর্যটন গন্তব্য হিসেবে প্রয়োজনীয় সেবা কাঠামো এখনো গড়ে ওঠেনি।

বিদেশি পর্যটকদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি ও পরিকল্পিত তথ্যসেবা, নির্দেশনা, বহুভাষিক সহায়তা, মানসম্মত টয়লেট, নিরাপদ চলাচলের ব্যবস্থা এবং ডিজিটাল তথ্যসেবার ঘাটতি রয়েছে। ফলে জাফলংয়ের সমস্যা পর্যটক আকর্ষণের নয়; বরং আকর্ষণকে টেকসই ও আন্তর্জাতিক মানের পর্যটন পণ্যে রূপ দেওয়ার ব্যবস্থাপনা ঘাটতির।

পর্যটকদের চোখে অবকাঠামোগত ঘাটতি

রাজশাহী থেকে আসা মেহেদী হাসান জানান, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য তাঁকে মুগ্ধ করেছে। তবে পর্যটনকেন্দ্রের ভেতরের চলাচলের রাস্তা, বসার জায়গা ও বিশ্রামাগারের অভাব তাঁকে হতাশ করেছে। তারপরও তিনি আবার জাফলংয়ে আসতে চান এবং অন্যদেরও আসার পরামর্শ দেবেন।

ঢাকার পর্যটক নাজমুল হক চৌধুরীও পরিবারের সদস্যদের নিয়ে জাফলং ঘুরতে এসে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়েছেন। তবে পর্যটন ব্যবস্থাপনায় আরও পরিকল্পিত উদ্যোগের প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।

মাঠপর্যায়ের পর্যবেক্ষণ ও পর্যটকদের মতামত মিলিয়ে জাফলংয়ের সবচেয়ে বড় পাঁচ ঘাটতি হিসেবে উঠে এসেছে-বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা, পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা, মানসম্মত টয়লেট, ছায়া ও বিশ্রামের জায়গা এবং পার্কিং ও যাতায়াত ব্যবস্থাপনা।

বিশেষজ্ঞদের চোখে সম্ভাবনা, চ্যালেঞ্জ বাস্তবায়ন

জাফলংকে কেবল একটি দর্শনীয় স্থান হিসেবে না দেখে সমন্বিত পর্যটন অঞ্চলে রূপ দেওয়া সম্ভব। নদীকেন্দ্রিক পর্যটন, প্রকৃতি পর্যটন, সীমান্ত পর্যটন, আলোকচিত্র, অ্যাডভেঞ্চার, স্থানীয় সংস্কৃতি ও খাসিয়া জনগোষ্ঠীর জীবনধারা-সব মিলিয়ে এখানে বৈচিত্র্যময় পর্যটন পণ্য তৈরি করা সম্ভব।

সংবাদটি ভালো লাগলে স্যোশাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন
27 August 2026

জাফলংয়ে প্রকৃতি আছে, পর্যটন ব্যবস্থাপনা কোথায়?

বিস্তারিত কমেন্টে