
মনসুর আলম, গোয়াইনঘাট ::: বাঘ আতঙ্কে এবার সিলেটের গোয়াইনঘাটে মেছোবিড়ালকে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ উঠেছে। মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) সকাল সাড়ে ১১টার দিকে উপজেলার সদর ইউনিয়নের লাঠি গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। এর আগে গত জুলাইয়ে পার্শ্ববর্তী জৈন্তাপুর উপজেলায় ‘বাঘ আতঙ্ক’ ছড়িয়ে পড়ার পর একটি মেছোবিড়াল মৃত অবস্থায় উদ্ধার করেছিল বন বিভাগ। এক মাসের ব্যবধানে একই ধরনের আতঙ্কে আবারও একটি সংরক্ষিত বন্যপ্রাণী হত্যার ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে সচেতনতার ঘাটতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত ১৫ আগস্ট রাতে উপজেলার পশ্চিম জাফলং ইউনিয়নের হাতিরখাল গ্রামের উত্তর মহল্লায় প্রাণীটিকে প্রথম দেখা যায়। বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল খালেকসহ গ্রামের কয়েকজন সেটিকে দেখেন। প্রাণীটি দেখতে বাঘের মতো হওয়ায় মুহূর্তেই এলাকায় ‘বাঘ এসেছে’-এমন আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। পরে মসজিদের মাইকে ঘোষণা দিয়ে গ্রামবাসীকে সতর্ক করা হয়।
স্থানীয় বাসিন্দা মো. শাহীন আলম জানান, প্রাণীটিকে দেখে প্রথমে তাঁরও বাঘ বলেই মনে হয়েছিল। পরে বিষয়টি বন বিভাগকে জানিয়ে রাতে তোলা একটি ছবি পাঠান। বন বিভাগের পক্ষ থেকে ছবিটি দেখে জানানো হয়, এটি বাঘ নয়, মেছোবিড়াল। বিষয়টি অন্যদের জানাতে তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও পোস্ট করেন। তবে এর আগেই এলাকায় বাঘ আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
স্থানীয় বাসিন্দা কামাল হোসেন জানান, মঙ্গলবার সকালে গ্রামের একটি বিদ্যালয়ের পাশে এক স্কুলছাত্রী প্রাণীটিকে দেখতে পায়। আতঙ্কিত হয়ে চিৎকার শুরু করলে আশপাশের লোকজন লাঠিসোঁটা নিয়ে সেখানে ছুটে আসেন। মানুষের উপস্থিতি টের পেয়ে প্রাণীটি পাশের একটি কবরস্থানে আশ্রয় নেয়। পরে কয়েকজন সেটিকে খুঁজে বের করে পিটিয়ে হত্যা করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রাণীটিকে হত্যার পাশাপাশি পুরো ঘটনার ভিডিও ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। লাঠি গ্রামের শওকত আলীর ছেলে তাজ উদ্দীন ওই প্রাণীটিকে পিটিয়ে হত্যায় অংশ নেন এবং তিনিই ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়েছেন বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। তবে এ অভিযোগের বিষয়ে তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
ঘটনার বিষয়ে সারী রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. শাহআলম বলেন, এটি মেছো বাঘ নয়, মেছোবিড়াল। ঘটনার ভিডিও ফুটেজ দেখে জড়িতদের শনাক্তের চেষ্টা চলছে। প্রাণীটিকে পিটিয়ে হত্যার পর হত্যার প্রমাণ নষ্ট করতে নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে তথ্য পাওয়া গেছে। ফলে এটি পুরুষ না নারী, তা শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। জড়িতদের শনাক্তের পর প্রচলিত বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইনে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি বলেন, মেছোবিড়াল মানুষের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ প্রাণী নয়। বরং জলাভূমির পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের ভারসাম্য রক্ষায় এ প্রাণীর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। বর্ষা মৌসুমে হাওর-বাঁওড়, বিল ও পুকুরে মাছসহ অন্যান্য খাবারের সন্ধানে পাহাড় ও বনাঞ্চল থেকে মেছোবিড়াল লোকালয়ের কাছাকাছি চলে আসতে পারে।
বন বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, মেছোবিড়াল জলাভূমির খাদ্যশৃঙ্খলের গুরুত্বপূর্ণ শিকারি। মাছ, ইঁদুর, সাপ ও ব্যাঙসহ বিভিন্ন প্রাণী শিকার করে এটি জলাভূমির ভারসাম্য রক্ষায় ভূমিকা রাখে। একই সঙ্গে মরা ও পচা মাছ খেয়ে জলাশয়ের পরিবেশও পরিষ্কার রাখতে সহায়তা করে। তাই এটিকে বাঘ ভেবে হত্যা করা শুধু একটি বন্যপ্রাণী হত্যার ঘটনা নয়, এটি স্থানীয় জীববৈচিত্র্যের জন্যও ক্ষতিকর।
গোয়াইনঘাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. ওমর ফারুক মোড়ল বলেন, এ ঘটনায় থানায় কোনো অভিযোগ পাওয়া যায়নি। বিষয়টি বন বিভাগ দেখছে। অভিযোগ পেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এর আগে গত ৬ জুলাই থেকে জৈন্তাপুর উপজেলার সীমান্তবর্তী শ্রীপুর চা-বাগান ও আশপাশের এলাকায় তিনটি গরুর রহস্যজনক মৃত্যুকে কেন্দ্র করে ‘বাঘ আতঙ্ক’ ছড়িয়ে পড়ে। গ্রামবাসী রাতভর দলবেঁধে লাঠিসোঁটা নিয়ে পাহারা দেন। গরুগুলোর শরীরে আক্রমণের চিহ্ন দেখে অনেকে বাঘের উপস্থিতি রয়েছে বলে ধারণা করেছিলেন। তবে বন বিভাগ তখন জানিয়েছিল, বাঘের উপস্থিতি নিশ্চিত হওয়ার মতো কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
পরে আতঙ্কিত এলাকার প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে জৈন্তাপুরের হরিপুর এলাকায় বাঘের সড়ক ও ১০ নম্বর গ্যাসকূপের মধ্যবর্তী স্থান থেকে একটি পূর্ণবয়স্ক পুরুষ মেছোবিড়াল মৃত অবস্থায় উদ্ধার করে বন বিভাগ। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হয়, কোনো যানবাহনের ধাক্কায় প্রাণীটির মৃত্যু হয়েছে। পরে বন বিভাগের তত্ত্বাবধানে সেটিকে দাফন করা হয়। এর আগে আতঙ্কিত এলাকায় সিসিটিভি বসিয়েও বাঘের উপস্থিতির কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
স্থানীয় প্রবীণদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, একসময় এ অঞ্চলে বাঘের আতঙ্ক ছিল। জনবসতি ও মানুষের বিচরণ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বন্যপ্রাণীর বিচরণও কমে আসে। দীর্ঘদিন পর কোনো বন্যপ্রাণী লোকালয়ে দেখা দিলে অনেকেই তার আকৃতি বা পায়ের ছাপ দেখে বাঘ বলে ধরে নেন। এবারও একইভাবে আতঙ্ক ছড়িয়েছে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
বন বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, বন্যপ্রাণী লোকালয়ে ঢুকলে সেটিকে ধাওয়া বা হত্যা না করে দ্রুত বন বিভাগকে খবর দেওয়া প্রয়োজন। ছবি বা ভিডিও সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্টদের জানালে প্রাণীটি শনাক্ত করা এবং নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া সম্ভব। একই সঙ্গে স্থানীয় পর্যায়ে বন্যপ্রাণী সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো জরুরি।
প্রশ্ন উঠেছে, জৈন্তাপুরের ঘটনার পরও কেন গোয়াইনঘাটে একই ধরনের আতঙ্ক প্রাণী হত্যার ঘটনায় পরিণত হলো? স্থানীয়দের কেউ কেউ মনে করছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যাচাই-বাছাই ছাড়া তথ্য ছড়িয়ে পড়া এবং বন্যপ্রাণী সম্পর্কে অজ্ঞতার কারণেই আতঙ্ক দ্রুত সহিংসতায় রূপ নিচ্ছে। বন বিভাগ বলছে, ভিডিও ফুটেজের মাধ্যমে জড়িতদের শনাক্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে শুধু আইন প্রয়োগ নয়, ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা ঠেকাতে স্থানীয়দের সচেতন করাও জরুরি।
সংবাদটি ভালো লাগলে স্যোশাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন