মনসুর আলম,গোয়াইনঘাট ::: বাংলাদেশের অন্যতম অনন্য প্রাকৃতিক সম্পদ রাতারগুল মিঠাপানির জলাবন। ৩ হাজার ৩২৫ দশমিক ৬১ একর আয়তনের এ বনের ৫০৪ একর ১৯৭৩ সালে বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য হিসেবে ঘোষণা করা হয়। বর্ষায় পানিতে ডুবে থাকা গাছপালা, নৌকায় বনের ভেতর ঘোরার সুযোগ এবং সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্যের কারণে প্রতিবছর দেশ-বিদেশের বিপুলসংখ্যক পর্যটক এখানে আসেন। তবে পর্যটনের চাপ বাড়লেও সেই অনুপাতে ব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়নি। সরেজমিন অনুসন্ধানে এমন চিত্রই উঠে এসেছে।
রাতারগুলে প্রতিদিন কতসংখ্যক পর্যটক প্রবেশ করতে পারবেন-এমন কোনো নির্ধারিত ধারণক্ষমতা নেই। বন বিভাগের কর্মকর্তার হিসাবে সাধারণ দিনে তিন শতাধিক পর্যটক আসেন। শুক্রবার ও শনিবার এ সংখ্যা পাঁচ শতাধিক হয়। বিশেষ দিনগুলোতে পর্যটকের চাপ আরও বেড়ে যায়। তবে স্থানীয় মাঝিদের হিসাবে সাপ্তাহিক ছুটির দিনে পর্যটকের সংখ্যা প্রায় দুই হাজার পর্যন্ত হয়।
অর্থাৎ পর্যটকের প্রকৃত সংখ্যা নিয়েও রয়েছে তথ্যের ব্যবধান। অথচ বিপুল পর্যটকের চাপ সামলাতে কতজন পর্যটক পর্যন্ত রাতারগুলের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের ওপর সহনীয় প্রভাব থাকবে-সেই ‘ক্যারিং ক্যাপাসিটি’ নির্ধারণ করা হয়নি।
রাতারগুলের ১, ২ ও ৩ নম্বর ঘাট মিলিয়ে প্রায় ২৫০টি নৌকা চলাচল করে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। নৌকা চলাচল উপজেলা প্রশাসনের নির্ধারিত ব্যবস্থার আওতায় থাকলেও সরেজমিনে নৌযানে পর্যটকদের নিরাপত্তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ লাইফ জ্যাকেটের ব্যবহার দেখা যায়নি।
দুর্ঘটনা ঘটলে তাৎক্ষণিক উদ্ধার ব্যবস্থারও ঘাটতি রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, এলাকার ফায়ার সার্ভিস ছাড়া নির্দিষ্ট কোনো তাৎক্ষণিক উদ্ধারব্যবস্থা নেই। মাঝিদের প্রশিক্ষণ ও নৌযান নিরাপত্তাব্যবস্থার বিষয়েও মাঠপর্যায়ে স্পষ্ট কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
নৌকা ভাড়াও পর্যটকদের অভিযোগের একটি বড় বিষয়। ঢাকা থেকে সহপাঠীদের নিয়ে আসা শিক্ষার্থী নাঈম আহমেদ খান বলেন, নৌকা ভাড়া তাদের মতো মধ্যবিত্ত পরিবারের শিক্ষার্থীদের জন্য বেশি। ভাড়া কমানো গেলে আরও বেশি মানুষ রাতারগুল ঘুরে দেখার সুযোগ পেতেন।
রাতারগুলের অন্যতম বড় আকর্ষণ ছিল বনের ভেতরে নির্মিত ওয়াচ টাওয়ার। ২০১৪ সালে বন বিভাগ দর্শনার্থীদের এক জায়গা থেকে পুরো জলাবনের সৌন্দর্য দেখার সুযোগ দিতে টাওয়ারটি নির্মাণ করে। কিন্তু নির্মাণের কয়েক বছরের মধ্যেই এটি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে। বর্তমানে পর্যটকদের ওঠা নিষিদ্ধ।
সরেজমিনে দেখা যায়, দীর্ঘদিন ধরে ওয়াচ টাওয়ারটি ব্যবহার অনুপযোগী অবস্থায় পড়ে আছে। ফলে দূরদূরান্ত থেকে আসা পর্যটকরা জলাবনের ওপর থেকে পুরো এলাকার দৃশ্য দেখার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
রাজবাড়ী থেকে আসা সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) জাহিদ উদ্দিন মোল্লা বলেন, রাতারগুলের সৌন্দর্য অসাধারণ। কিন্তু একমাত্র ওয়াচ টাওয়ারটিও দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকায় ওপর থেকে পুরো জলাবনের দৃশ্য উপভোগ করা যাচ্ছে না। এত বড় সংরক্ষিত জলাবনে পর্যটকদের জন্য একটি নিরাপদ ও আধুনিক ওয়াচ টাওয়ার থাকা প্রয়োজন।
বন বিভাগ জানিয়েছে, পুরোনো টাওয়ারটি ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় প্রায় তিন বছর ধরে পর্যটকদের জন্য বন্ধ রাখা হয়েছে। নতুন একটি ওয়াচ টাওয়ার নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সংরক্ষিত বনের ভেতরে বড় ধরনের শব্দদূষণ সরেজমিনে চোখে না পড়লেও বনের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া গোয়াইন-চেঙ্গেরখাল নদীতে ইঞ্জিনচালিত নৌকার শব্দ বনের গভীর অংশ পর্যন্ত শোনা যায়। বন বিভাগের কর্মকর্তাদের ভাষ্য, ইঞ্জিনের শব্দে অনেক সময় জলজ প্রাণী ও বন্যপ্রাণী বিচলিত হয়ে স্থান পরিবর্তন করে।
অন্যদিকে পর্যটকদের উচ্চ শব্দ, হৈ-হুল্লোড় ও গান-বাজনার কারণেও বন্যপ্রাণীর ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ছে বলে বন বিভাগের বিট কর্মকর্তা জানিয়েছেন।
তবে সরেজমিনে বনের ভেতরে বড় ধরনের প্লাস্টিক বর্জ্য বা ময়লা দেখা যায়নি। প্রশাসনের নির্ধারিত ব্যবস্থায় পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা বর্জ্য পরিষ্কার করছেন বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। গাছ কাটার অভিযোগও মাঠপর্যায়ে পাওয়া যায়নি। বর্ষাকালে পানির স্বচ্ছতাও মোটামুটি ভালো দেখা গেছে।
রাতারগুলে হিজল, করচ, বরুণ, পিঠালি, অর্জুন, ছাতিম, গুটিজাম, বটসহ বিভিন্ন প্রজাতির গাছ রয়েছে। জলাবনের এই পরিবেশে সাপ, বানর, গুইসাপসহ নানা প্রাণী এবং সাদা বক, কানা বক, মাছরাঙা, টিয়াসহ বিভিন্ন প্রজাতির পাখির দেখা মেলে।
সরেজমিনে সাদা বক, কানা বক ও মাছরাঙা দেখা গেছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, সংরক্ষিত এলাকায় বাঁধ বা প্রতিবন্ধকতা না থাকায় বিভিন্ন প্রজাতির মাছ ও সরীসৃপ পার্শ্ববর্তী গোয়াইন নদী ও হাওর এলাকায়ও চলাচল করতে পারে।
গত পাঁচ বছরে রাতারগুলে দৃশ্যমান বড় কোনো অবকাঠামোগত উন্নয়ন হয়নি বলে মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। বন বিভাগের প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা ও শৃঙ্খলা ছাড়া উল্লেখযোগ্য উন্নয়নের তথ্য পাওয়া যায়নি।
বন বিভাগে বর্তমানে একজন বিট কর্মকর্তা ও চারজন বনপ্রহরী দায়িত্ব পালন করছেন। সরেজমিনে দু-একজন বনকর্মীকে টহল দিতে দেখা গেছে। তবে এত বড় বনাঞ্চল ও বিপুলসংখ্যক পর্যটকের চাপের তুলনায় এই জনবল যথেষ্ট কি না-সেটিও প্রশ্ন হয়ে দেখা দিয়েছে।
রাতারগুলে পর্যটকদের কাছ থেকে প্রবেশ ফি আদায় করা হলেও এ প্রতিবেদকের অনুসন্ধানে দৈনিক বা বার্ষিক রাজস্বের সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি। সেই অর্থ কোথায় এবং কীভাবে ব্যয় করা হয়-এ বিষয়েও তাৎক্ষণিকভাবে কোনো হিসাব পাওয়া যায়নি।
কর্তৃপক্ষের দাবি, আগের তুলনায় পর্যটন থেকে আয় অনেকটাই কমেছে। কিন্তু পর্যটকের প্রকৃত সংখ্যা, টিকিট বিক্রি ও রাজস্বের সমন্বিত হিসাব প্রকাশ না থাকায় বিষয়টি স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
রাতারগুলে প্রবেশপথের ২ ও ৩ নম্বর ঘাটের সড়কের বিভিন্ন অংশ খানাখন্দে ভরা। কোথাও রাস্তা সরু। পর্যাপ্ত পার্কিং ব্যবস্থা না থাকায় শুক্রবার দুপুর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত পর্যটকবাহী গাড়ির দীর্ঘ যানজট দেখা গেছে।
স্থানীয় দোকানি ও চা-পান বিক্রেতা আহমেদের ভাষ্য, পর্যটকের উপস্থিতি থাকলে বেচাকেনা ভালো হয়। মাঝি রেজওয়ান আহমেদ বলেন, বিশেষ দিন ও সাপ্তাহিক ছুটিতে আয় ভালো হয়; অন্য দিনগুলোতে আয় তুলনামূলক কম।
শুক্রবার দুপুর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত সরেজমিন পরিদর্শনে টুরিস্ট পুলিশের পোশাক পরা কাউকে পাওয়া যায়নি। দূরে একজন পুলিশ সদস্যকে দেখা গেলেও তার সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি।
রাতারগুল টুরিস্ট জোনসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সাইনবোর্ডে হেল্পলাইন নম্বর দেওয়া থাকলেও এ প্রতিবেদকের পক্ষ থেকে যোগাযোগের চেষ্টা করে কয়েকটি সরকারি নম্বর বন্ধ পাওয়া যায়। ফলে পর্যটকদের জরুরি প্রয়োজনে এসব নম্বর কতটা কার্যকর, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
রাতারগুলের নিরাপত্তা, নৌকা ভাড়া, লাইফ জ্যাকেট ও যানজটের বিষয়ে গোয়াইনঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রতন কুমার অধিকারী বলেন, লাইফ জ্যাকেট ও নির্ধারিত ভাড়ার বিষয়ে অভিযোগ পর্যালোচনা করা হবে। যানজট ও পার্কিং সমস্যার বিষয়েও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সারী রেঞ্জের বন কর্মকর্তা মো. শাহ আলম বলেন, রাতারগুলসহ বনের পতিত জমিতে নতুন পরিকল্পনার কিছু উদ্যোগ নেওয়া হবে। বনপ্রহরী ও বিট কর্মকর্তা সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করছেন। নদীতে ইঞ্জিনচালিত নৌকা চলাচলের ক্ষেত্রে বন বিভাগের সরাসরি নিয়ন্ত্রণ সীমিত। তবে ইঞ্জিনের শব্দে জলজ প্রাণী ও বন্যপ্রাণী বিচলিত হওয়ার বিষয়টি তিনি স্বীকার করেন। ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় পুরোনো ওয়াচ টাওয়ার পর্যটকদের জন্য বন্ধ রাখা হয়েছে এবং নতুন ওয়াচ টাওয়ার নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
রাতারগুলের ৫০৪ একর সংরক্ষিত বনকে আরও কার্যকরভাবে রক্ষায় প্রয়োজনীয় পরিবেশগত সুরক্ষা নিশ্চিত করার দীর্ঘদিন ধরে দাবী জানিয়েছেন পরিবেশবিদরা । পর্যটনের নামে অবকাঠামো নির্মাণ, অনিয়ন্ত্রিত নৌযান, শব্দদূষণ ও পর্যটকের চাপ যাতে জলাবনের স্বাভাবিক পরিবেশ নষ্ট না করে, সেদিকে এখনই নজর দেওয়া প্রয়োজন বলে মত দিয়ে আসছেন পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো।
রাতারগুলের সৌন্দর্য এখনো পর্যটকদের মুগ্ধ করে। মাঝিদের গানে নৌকায় বসে পর্যটকদের উল্লাসও দেখা যায়। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে-এই সৌন্দর্যকে টিকিয়ে রাখতে ব্যবস্থাপনা কতটা প্রস্তুত?
একদিকে বিপুল পর্যটক, শত শত নৌকা ও বাড়তে থাকা পর্যটননির্ভর অর্থনীতি; অন্যদিকে নেই নির্ধারিত পর্যটক ধারণক্ষমতা, নৌযানে দৃশ্যমান লাইফ জ্যাকেটের ব্যবহার, কার্যকর জরুরি উদ্ধারব্যবস্থা ও চালু ওয়াচ টাওয়ার। ফলে রাতারগুল এখন এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যেখানে পর্যটন বাড়ানোর আগে জলাবনের পরিবেশ ও নিরাপত্তার সক্ষমতা নিশ্চিত করাই সবচেয়ে জরুরি।
সম্পাদক মণ্ডলীর সভাপতি : নূরুর রশীদ চৌধুরী, সম্পাদক : ফাহমীদা রশীদ চৌধুরী, সহকারী সম্পাদক : ফাহমীনা নাহাস
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : অপূর্ব শর্মা