
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচন সবসময়ই দেশের রাজনৈতিক প্রবণতা ও ভবিষ্যতের একটি নির্দেশক হিসেবে বিবেচিত হয়। ২০২৫ সালের ৯ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত ডাকসু নির্বাচনেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। দেশের বৃহত্তম রাজনৈতিক দল বিএনপি এই নির্বাচনের ফলাফলের মাধ্যমে একটি গুরুত্বপূর্ণ আগাম বার্তা পেয়েছে যে, আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন হবে তাদের জন্য শুধুমাত্র একটি সাধারণ প্রতিদ্বন্দ্বিতা নয়, বরং রাজনীতিতে টিকে থাকার লড়াই।
ডাকসু নির্বাচনে ছাত্রদলের পরাজয়, যা ছাত্ররাজনীতিতে বিএনপির ভূমিকা ও সংগঠন পরিচালনার কাঠামো নতুন করে প্রশ্নের মুখে পড়েছে। এটি শুধুই শিক্ষাঙ্গনের চিত্র নয়, বরং জাতীয় পর্যায়ের একটি প্রতিফলন। তরুণ সমাজের মনোভাব, সাংগঠনিক দুর্বলতা, প্রচারণার ঘাটতি, আধুনিক রাজনৈতিক কৌশলের অভাব, এইসবই একটি বড় নির্বাচনে ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে এবং ডাকসু তারই পূর্বাভাস দিয়েছে।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে অন্যতম বৃহৎ দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দীর্ঘ ১৬ বছর ধরে আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে এক কঠিন সময় পার করেছে বিএনপি। খুন, গুম, হামলা, মামলা, গ্রেফতার, জুলুম এসব মোকাবিলা করে দলের নেতাকর্মীরা যে স্বস্তির প্রত্যাশা করেছিল, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে এসে সেই প্রত্যাশা যেন দুঃস্বপ্নে রূপ নিচ্ছে। বর্তমান বাস্তবতায় বিএনপির রাজনীতি এখন দ্বিমুখী চ্যালেঞ্জ! একদিকে অভ্যন্তরীণ কোন্দল, অন্যদিকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার পুনরুত্থান।
সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) ১৮টি হলের আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা নিয়ে নানা সমালোচনা ও বিতর্ক দেখা দেয়। অভিযোগ উঠেছে কমিটিতে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের অনেক নেতা–কর্মী রয়েছেন। এসব কমিটি নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের অনেক নেতাও অভিযোগ করেছেন। তাঁদের ভাষ্যমতে, দলের দুঃসময়ে কমিটিতে ‘ত্যাগী ও পরীক্ষিত’ নেতাদের বাদ দিয়ে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের পছন্দের কর্মীদের গুরুত্বপূর্ণ পদ দেওয়া হয়েছে!
সর্বোপরি বিএনপি এক কঠিন বাস্তবতার মুখে দাঁড়িয়ে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে নিয়ে ভাবতে হবে। দীর্ঘদিনের আন্দোলন-সংগ্রাম, রাজনৈতিক সহিংসতা ও দমন-পীড়নের ইতিহাস পেরিয়ে দলটিকে এখন একটি শক্তিশালী গণভিত্তি গড়ে তোলার প্রয়াস চালিয়ে যেতে হবে।
দল গোছাতে বিএনপিকে কেন্দ্র থেকে ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত সব কমিটিকে সক্রিয় ও হিসাবযোগ্য করতে হবে। বিভক্তি ও গ্রুপিং দূর করে ঐক্যবদ্ধ নেতৃত্ব গঠন জরুরি। নিয়মিত গণসংযোগ, জনসভা ও জনদুর্ভোগ নিয়ে আন্দোলন চালিয়ে যেতে হবে। দলের ভেতর ঐক্য এবং পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্দেশনা বাস্তবায়ন অপরিহার্য।
জনগণের আস্থা ফেরাতে বিএনপির দরকার সুসংগঠিত দল, স্বচ্ছ মনোনয়ন ও ঐক্যবদ্ধ বার্তা। তা না হলে নির্বাচনী মাঠে টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়বে, এমনটাই বলছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
দেশব্যাপী বিএনপির অনেক জেলা ও উপজেলা কমিটিতে বিরোধ, দ্বন্দ্ব ও মনোমালিন্য স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান। বিশেষ করে জেলা পেরিয়ে উপজেলাগুলোতে গ্রুপিং দ্বন্দ্ব এখন দৃশ্যমান রূপ নিয়েছে। কেউ কেউ মাঠে থাকার চেয়ে পদবী রক্ষায় বেশি মনোযোগী। অনেক সময় দেখা যায় দলের ত্যাগীরা অবমুল্যায়িত হয়ে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছেন। তাছাড়া দলের সাধারণ কর্মী সমর্থকরা গ্রুপিং দ্বন্দ্বে না জড়িয়ে নীরব থাকার চেষ্ঠা করছেন। ফলে কেন্দ্রের সিদ্ধান্ত অনেকক্ষেত্রে মাঠপর্যায়ে কার্যকর হচ্ছে না।
দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান আগামীর বাংলাদেশ নিয়ে যে ৩১ দফা 'রাষ্ট্র মেরামতের রূপরেখা' দিয়েছেন, তা সাধারণ মানুষের মাঝে আশার আলো জাগালেও, দলের অভ্যন্তরে সেই নির্দেশনার প্রতিফলন পাওয়া যাচ্ছে না।
তারেক রহমানের বক্তব্যে স্পষ্টতা ফুটে ওঠে যে, সামনের পথ মোটেও মসৃণ না। পলাতক স্বৈরাচার দেশে চুরি, দুর্নীতি, লুটপাট করে সব সাফা করে দিয়ে গেছে। বিচার ব্যবস্থা, প্রশাসন, পুলিশসহ রাষ্ট্রের সব প্রতিষ্ঠান ভেঙে-চুরে ধ্বংস করে দিয়েছে। আগামিতে যে দল দেশ পরিচালনার দায়িত্ব পাবে তাদের অনেক কষ্ট করতে হবে। তিনি আরো বলেন, বিএনপি ক্ষমতায় যাওয়া নয়, জনগণ দেশ পরিচালনার দায়িত্ব দিতে পারে বিএনপিকে। এই দায়িত্ব পেতে হলে সাধারণ মানুষের কাছে যেতে হবে এবং নেতাকর্মীদের ভোট আদায়ে ব্যস্ত থাকতে হবে। বন্ধ করতে হবে নিজেদের মধ্যে গ্রুপ আর দ্বন্দ্ব। তাই ৩১ দফা বাস্তবায়নের মাধ্যমে তিনি একটি নতুন, গণতান্ত্রিক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেন। এই রূপরেখা শুধু রাজনৈতিক পরিবর্তনের নয়, বরং সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নেরও প্রতিশ্রুতি বহন করে।
এদিকে বিএনপির এই বিভ্রান্ত ও অসংগঠিত অবস্থার সুযোগ নিচ্ছে অন্যান্য রাজনৈতিক শক্তি। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণ শুরু হয়েছে। বিএনপিকে বাদ রেখেই বিকল্প বিরোধী শক্তি গড়ে তোলার নেপথ্য চেষ্ঠায় রয়েছে কিছু দল ও জোট। ফলে বিএনপি যদি এখনই সংগঠনকে শক্তিশালী ও ঐক্যবদ্ধ করতে না পারে, তাহলে নির্বাচনে বড় মূল্য দিতে হতে পারে বিএনপিকে!
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এখন সময় বিএনপিকে কৌশলী ও দায়িত্বশীল হওয়ার। শুধু কেন্দ্র নয়। স্থানীয় পর্যায়ের নেতাকর্মীদেরও তারেক রহমানের দেওয়া নির্দেশনা বাস্তবায়নে সক্রিয় হতে হবে। দলে ঐক্য ফিরিয়ে এনে নেতৃত্বের প্রতি আস্থা ও শৃঙ্খলা ফিরিয়ে না আনলে আগামী নির্বাচনে বিএনপির অবস্থান আরও দুর্বল হয়ে পড়বে।
দলটির চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার একটি ঐতিহাসিক স্লোগান ছিল: "ব্যক্তির চেয়ে দল বড়, দলের চেয়ে দেশ বড়"-এ স্লোগান কোথায়? ক'জন নেতা এই শ্লোগান লালন করে রাজনীতির মাঠে আছেন?
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে মনোনয়ন প্রক্রিয়ায়ও স্বচ্ছতা ও দায়িত্ববোধের পরিচয় দিতে হবে। বারবার দেখা গেছে, ত্যাগী, যোগ্য নেতা বাদ পড়ে বিতর্কিত প্রার্থী মনোনয়ন পেয়েছে, যা জনগণের আস্থা কমিয়ে দেয়। সেই ভুল পুনরাবৃত্তি হলে ফলাফল আরও ভয়াবহ হতে পারে।
বিএনপির মাঠ পর্যায়ে ত্যাগী ও নির্যাতিত নেতাকর্মীদের মনোনয়ন বিবেচনায় রাখতে হবে। আর্থিক প্রভাবের চেয়ে দলের প্রতি আনুগত্য, জনপ্রিয়তা ও ত্যাগের ইতিহাসকে প্রাধান্য দিতে হবে মনোনয়ন বাঁচাইয়ে।
ডাকসুর ফলাফল এও দেখিয়েছে, একক প্রচারণা বা আবেগ নয়, বরং কৌশল, ঐক্য, আধুনিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার, তরুণদের সম্পৃক্ততা এবং ইতিবাচক রাজনৈতিক ভাষ্য-এই সবই সফলতার মূল চাবিকাঠি।
১৬ বছরের সংগ্রামের পর যখন দলটির রাজনৈতিক পুনরুদ্ধারের সময় এসেছে ঠিক তখন অভ্যন্তরীণ কোন্দল, নেতা-প্রীতি ও শৃঙ্খলাহীনতা, সেই পথকে রুদ্ধ করে রেখেছে। বিএনপির সামনে এখন সময় সীমিত, কিন্তু সম্ভাবনা এখনো আছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে তাদের গঠনমূলক ও সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। দেশের গণতন্ত্র, রাজনৈতিক ভারসাম্য এবং সাধারণ মানুষের বিশ্বাস পুনরুদ্ধারের দায়িত্ব তাদের কাঁধে। ডাকসু থেকে শিক্ষা নিয়ে সেই দায়িত্ব পালনই এখন সময়ের দাবি। তবে সময় এখনো শেষ হয়ে যায়নি, দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন হতে পারে বিএনপির জন্য আরেকটি বড় ধাক্কা।
##
লেখক: স্টাফ রিপোর্টার, দৈনিক শ্যামল সিলেট ও যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, ফেঞ্চুগঞ্জ প্রেসক্লাব।
১১ সেপ্টেম্বর ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ।
সম্পাদক মণ্ডলীর সভাপতি : নূরুর রশীদ চৌধুরী, সম্পাদক : ফাহমীদা রশীদ চৌধুরী, সহকারী সম্পাদক : ফাহমীনা নাহাস
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : অপূর্ব শর্মা