
সাম্প্রদায়িকতা, গোঁড়ামি ও এগুলোর ভয়াবহ বিচিত্র রূপ এবং ধর্ম উন্মক্ততা আমাদের জনপদ, সমাজ, রাষ্ট্র দেশ ও তথা বিশ্ব ভূখন্ডকে বহুকাল অধি করে করে হিংসা, প্রতিহিংসার জন্ম দিয়ে আমাদের অস্তিত্ব, মানব সভ্যতাকে বার বার হুমকি প্রদান করেছে, করে চলেছে। সাম্প্রদায়িকতা কোন সম্প্রীতি মানে না, সাম্প্রদায়িকতা চোখের চশমকে হরণ করে, মানুষকে অজ্ঞানতার অন্ধ করে নিমজ্জিত করে।
সাম্প্রদায়িকতার পিশাচগুলো ধ্বসের বাতাবরণে তাদের হিংস্র নখর থাবা বিস্তার করে। শিক্ষা, জ্ঞান, বিজ্ঞান যতই সম্প্রসারিত হোক সাম্প্রদায়িকতা নানা ছলা কলায় শিক্ষা, বিজ্ঞানকে পাশ কাটিয়ে অন্ধকূপে সাগর রচনার কূটজাল বিস্তার করেই চলেছে। এর মধ্যে উন্নত চরিত্রের নরনারী জন্মগ্রহণ করে সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে কেহ কেহ বক্তব্য রেখেছেন, কেহ কেহ লেখনী ধরেছেন, কেহ বা নিজস্ব ধর্মপ্রবাহ দ্বারা তাকে প্রতিহত করতে ব্যাপৃত হয়েছেন। সকলকালে সকল জনপদে এমনিভাবে কিছু কিছু লোক সকল প্রতিকূলতা অগ্রাহ্য করে সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদমুখর হয়েছেন।
আমাদের এ বৃহত্তর জনপদ দীর্ঘদিন অসাম্প্রদায়িক চিন্তা চেতনার লালন ক্ষেত্র ছিল। বিদেশী শাসক গোষ্ঠী স্বীয় স্বার্থকে নিশ্চিত করনের জন্য এতদ্দেশে যে সাম্প্রদায়িকতার বীজ বপন করেছিল তার ধারাবাহিকতা আজ চলছে। বহুরূপেও বহুমাত্রায়। আমাদের দেশের রাজনীতি দীর্ঘদিন সাম্প্রদায়িকতা বিবর্জিত ছিল। এবং ততদিন ত্যাগী, ধৈর্য্যশীল বীরপুরুষরা রাজনীতিতে যোগ দিয়ে রাজনীতিকে করেছিলেন প্রতিষ্ঠিত নীতির রাজা হিসাবে। যেদিন থেকে এ গুনটি তিরোহিত সেদিন থেকে রাজনীতিও কলুষিত। রাজনীতি তার কৌলিন্য হারিয়ে কৃদ্রিমতা দোষে দুষ্ট হয়ে গিয়েছে। আজ তাই রাজনীতি যেমন নীতি বিবর্জিত তেমনি রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বরাও যাদের জন্য রাজনীতি করছেন তাদের সত্যিকারের প্রতিনিধি নন। এ উপমহাদেশের বড় বড় সংগ্রাম, সামাজিক আন্দোলন, রাজনৈতিক আন্দোলন যতদিন অসাম্প্রদায়িক ছিল ততদিন সংখ্যাগরিষ্ঠের ঐকান্তিক সমর্থনও সহানুভূতিতেই সার্থকরূপ লাভ করতে সমর্থ হয়েছিল। এই উপমহাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলন থেকে বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রাম ও স্বাধীনতা লাভ এর বাস্তব প্রতিফলন। আমাদের সিলেট, আসাম, বাংলা অঞ্চলে বহু রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব অসাম্প্রদায়িক শক্তির বলে বলীয়ান হয়ে নিজেদের এক বিশেষ ক্ষেত্র তৈরী করেছেন, পরিচিতির প্রবাদসম কাহিনী রচনা করেছেন এবং এর ফলশ্রুতিতে কাক্সিক্ষত লক্ষে পৌঁছতে ও সফল করে হয়েছিলেন। তেমনি একজন অধুনাকালে রাজনীতিবিদ, সাংবাদিক, চা-কর, শুদ্ধ সংস্কৃতির ধারক ও বাহক, বিপ্লবাদের অগ্নিচেতনায় উদ্বুদ্ধ, ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামের কর্মী আর বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলন, ভাষা-আন্দোলন ও স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশ পুনর্গঠনের একনিষ্ঠ দেশপ্রেমিক কর্মী, নেতা, সংগঠক জনাব আমিনূর রশীদ চৌধুরী। তিনি তাঁর সারাজীবনের কর্মের মধ্য দিয়ে সকল প্রকার সংকীর্ণতার উর্ধ্বে বিচরণ করে গিয়েছেন। সাম্প্রদায়িকতার হলাহল তিনি পান করেন নাই, অপসংস্কৃতির কাছে মাথা নত করেন নাই, স্বার্থপরতার যুগপটে নিজেকে বলীদান করেন নাই। সকল প্রকারের অত্যাচার, নির্যাতন, নিষ্পেষণ তাঁকে লক্ষ্যভ্রষ্ট করতে পারেনি। লোভ, লালসার কাছে আত্মসমর্পণ করে স্বীয় আদর্শ থেকে বিচ্যুত হননি। তিনি সকল কিছু ছেড়েছেন সবকিছু পাওয়ার জন্য। সৃষ্টি করেছিলেন এক নিজস্ব জগৎ, নিজস্ব বলয় ও পরিমন্ডল। এই বলয়ের বাসিন্দারা সবাই অসাম্প্রদায়িক, সবাই বিবেকবান, সংকীর্ণতা, কূপমূন্ডকতার উর্ধ্বে এক নিজস্ব ভুবন তৈরি করেছিলেন। আবাল্য এই বলয়ে সাহসিকতার সাথে বিচরণ করে স্বীয় কীর্তি ধ্বজা উড্ডীন করেছিলেন জনাব আমীনূর রশীদ চৌধূরী। রূপোর চামক মুখে নিয়ে জন্মগ্রহণ করলেও সে মর্যাদায় সমাসীন ছিলেন না। সাধারণ অবস্থার মধ্যে অবস্থান করে অসাধারণ কাজ করে নিয়েছেন। ত্যাগ আর তিতিক্ষার বলিষ্ঠতায় ইতিহাসে কিংবদন্তী ব্যক্তিত্বের মর্যাদা লাভ করেছেন। গভীর অন্ধকার ও নৈরাশ্যের মধ্যে নিষকম্প অগ্নিশিখার মত তাঁকে পথ দেখাত তাঁর অবিচল বিশ্বাস ও আদর্শ। কোন স্বার্থপরতাই তাঁকে তার আদর্শ থেকে বিচ্যুত করতে পারেনি। তাঁর অগ্নিসম বিশ্বাসই পথ চলার আলোকবর্তিকা হিসেবে কাজ করেছে। আর তারই ফলশ্রুতিতে দুর্গম পথে, দুঃসাহসিকযাত্রায় সচল ছিলেন সারাজীবন। যে পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন সে পরিবারের ছেলেকে কৈশোরে দেশ মাতৃকার মুক্তির জন্য কারাবাস করার কথা নয়। আরাম আয়াস আর বিলাসিতায় জীবন ভাসিয়ে দিতে পারতেন। তাঁর যে সময়ে জন্ম সে সময়ে না হলেও তার এক যুগ পরেই এ উপমহাদেশে সম্ভ্রান্ত হিন্দু-মুসলিম পরিবারগুলোতে সাম্প্রদায়িকতা প্রবেশ করে। সরকারী পৃষ্ঠপোষকতায় সাম্প্রদায়িকতার চর্চা করা হতো। অবস্থাসম্পন্নরা সাম্প্রদায়িকতাকে কুলীনতার একটি স্তর বলেই বিবেচনা করতেন। সাম্প্রদায়িক মনোভাব ও কর্মকান্ড তাদের জন্য সমাজে এক বিশেষ মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করেছিল। কিন্তু মিঃ আমীনূর রশীদ চৌধূরীর পারিবারিক ইতিহাসের পরিমন্ডলে এ আত্মপ্রতারণার মোহতা প্রবেশ করতে পারেনি। শিশুকাল থেকেই ভিন্নমত ও পথের অনুসারীদের সঙ্গে চলার ও সান্নিধ্য লাভের সুযোগে পরবর্তীকালের জ্যোতি মঞ্জিলের বাসিন্দা শৈশব থেকেই অন্তরের জ্যোতিকে উদ্ভাসিত হয়ে উঠেন। সুশিক্ষিত, স্বশিক্ষিত, রুচিশীল পারিবারিক পরিবেশ সন্তানদেরে অকৃত্রিম মানবতাবাদী ব্যক্তিত্ব হিসেবে গড়ে উঠায় শক্তি, সাহস ও ক্ষেত্র তৈরী করে দিয়েছিল। যার ফলে এ ভূখন্ড একজন যুগোপযোগী সমজদার রাজনীতিবিদকে পেয়েছিল, পরিশুদ্ধ সাংস্কৃতিক বলিষ্ঠ কর্মীকে পেয়েছিল। চিন্তায় কোন কলুষতা ছিল না, কর্মে কোন ভীরুতা ছিল না। সকল সময়ে নিজেকে নিজের সঠিক পথটি বেছে নিতে অসুবিধা হয়নি। সারাজীবন সে আলোকিত, পথ ধরেই চলেছেন, সার্থকতাও লাভ করেছেন অবলীলায়।
উনিশশত পনর সালের সতের নভেম্বর তারিখে জন্মগ্রহণকারী জনাব আমীনূর রশীদ চৌধূরী ছিলেন একজন চৌকুষ, সুপুরুষ, সুন্দর চেহারার অধিকারী। অতি সহজেই অন্যের দৃষ্টি আর্কষণ করতে পারতেন আবার অন্যকে আপন করে নিতেও ছিলেন সক্ষম। পরিবারের সবাই শিক্ষিত, মার্জিত, রুচিশীল ও সনাতনী ভব্য। জনাব আমীনূর রশীদ চৌধূরী তাঁর অন্যান্য ভাইবোনদের চেয়ে শিক্ষায়, রুচিতে, কর্মে ও মননে এক স্বাতন্ত্র্য ধারার অনুসারী ছিলেন। যার ফলে বিপ্লববাদে অনুপ্রাণিত হয়ে বিপ্লবীদের সঙ্গে সংযোগ রক্ষা করতে গিয়ে জীবন ঝুঁকির সম্মুখীন হয়। পুলিশি নির্যাতন ভোগ করতে হয়, করতে হয় বহুবার কারানিবাস। কারাবাসের ফলে জীবনে একেবারে সাধারণের সঙ্গে মিলিত হওয়া, তাদের সুখ দুঃখের ভাগীদার হওয়া যেমন সম্ভবপর হয়েছিল তেমনি শিমলনায় লেজিস লেটিভ কাউন্সিলের সভায় পিতার সঙ্গে যোগদান করে এ উপমহাদেশের তৎকালীন বরেণ্য ও স্মরণীয় প্রথিতযশা, রাজনীতিবিদ, সমাজকর্মী, ভূম্যাধিকারী সংস্কৃতিসেবী, উচ্চপদস্থ রাজকর্মচারী, বৃটিশরাজের সম্মানিত প্রতিনিধিদের সান্নিধ্য লাভ তার জীবন প্রণালীকে বিশুদ্ধ করে দেয়। এদের সংস্বার্থ তাকে অসাম্প্রদায়িক চেতনাসম্পন্ন রাজনৈতিকর্মী সংকীর্ণতামুক্ত, ব্যক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে প্রেরণা যুগিয়েছে। সচেতন ব্যক্তিটি তাই সাধারণের মতো থেকে অসাধারণ অনন্যসব কাজ করে যেতে সক্ষম হয়েছিলেন। বাল্যাবস্থা থেকে যেখানে সুন্দর, শুভ সেখানেই তিনি নিজেকে উপস্থাপিত করেছেন। সান্নিধ্য লাভ করতে ধর্মগোত্র বিচার করেননি, ব্যক্তি ও তার নীতি সর্বাগ্রে স্থান দিয়েছেন। ফলে সাম্প্রদায়িক বেড়াজালের উর্ধ্বে তাঁর বন্ধুত্বের সীমা সম্প্রসারিত ছিল। তাঁর গুণপণা ও অন্যান্য গুণপনাদের সঙ্গেই সংশ্লিষ্ট হতে সহায়তা দান করেছে।
ধর্মের বাড়াবাড়ি তিনি সহ্য করতেন না। ধর্মীয় গন্ডীর মধ্যে জীবনকে লালন করতে চাইতেন না। মাত্র তিন মাস বয়সে মিসেস বেল এর স্নেহকোলে লালিত হতে থাকেন। মিসেস বেল খৃস্টান ছিলেন। কিন্তু তাঁর সামঞ্জস্য রূপে বড় হতে ধর্ম কোন বাধাদান করেনি। দশ বার বৎসর বয়স পর্যন্ত এই অন্য ধর্মের পরিবারের সীমাবদ্ধ চৌকাঠে বড় হয়েও ধর্মীয় বিদ্বেষ হানাহানি তাঁকে স্বার্থ করতে পারেনি, তাঁর বাল্যের সহপাঠী, বন্ধু-বান্ধব নিজ ধর্মের লোক না হওয়াতে অন্য ধর্মের প্রতি ছোটকাল থেকেই সহমর্মীতা ও সহনশীলতায় পরিপুষ্ট হন। সারাজীবন এ পরিপূর্ণতা সতেজ ছিল। রাজনীতির কলুষতায়, ফরমায়েশী সংস্কৃতির উপঢৌকনে তাঁর মধ্যে দোদুল্যমানতা আনতে পারেনি আর এখানেই ছিল তাঁর জীবনের চরম সাফল্যের বীজ। জীবনের সকলস্তরের শিক্ষার এ ছোট্টবোধই তাঁকে আলোকিত করেছিল, ক্ষণজন্মা করে তুলেছিল, প্রগতিশীল করেছিল, অন্যায়, অসত্যের বিরুদ্ধে গর্জে উঠতে সাহস জাগিয়ে তুলেছিল। সাম্প্রদায়িক বলয়ের লোক সার্বজনীন সহ্য কিছু করতে পারে না। তার কোন উদাহরণ নেই। তাদের কাজ হবে এক পেষে, সীমাবদ্ধ, পাঁচ শতকের সীমাবদ্ধ বাসভূমের মতো। খোলামেলা নির্মল বন্ধুর সেখানে অভাব। জনাব আমীনূর রশীদ চৌধূরীর এই সুস্থ চিন্তাই রাজনীতি, সংস্কৃতি ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত হতে সুদৃঢ় শেকড়ের কাজ করেছে। ক্যালকাটা বয়েজ স্কুলে তাঁর বাল্যশিক্ষা শুরু হয়। এ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি আমেরিকান অধ্যক্ষ দ্বারা পরিচালিত ছিল এবং এশিয়ার বিভিন্ন দেশের ভিন্ন ভিন্ন ধর্মের ছাত্ররা পড়াশুনা করত। ফলে সেখানকার শিক্ষা তাঁর সার্বজনীন মননশীলতার উৎকর্ষতা বৃদ্ধিতে সার্বিক সহায়তা প্রদান করেছিল। পাশ্চাত্য শিক্ষার বাহনের মাধ্যমে প্রাথমিক শিক্ষা শুরু করলেও নিজ মাতৃভাষা, নিজ দেশ ও সাধারণ জীবনের চিত্র তাঁর মনে ছাপ ফেলেছিল। এ দাগ কোনদিন মুছেনি বরং দিন দিন গভীরতর হয়েছিল।
পারিবারিক পরিবেশ ও শিক্ষা, বয়োজ্যেষ্ঠদের দ্বারা যথাযথভাবে পরিচালনাই ব্যতিক্রমধর্মী পরিবারে জন্মগ্রহণ করে নাড়িগতভাবে এ দেশের মানুষ না হয়েও এ দেশের মানুষের দুঃখ কষ্টের সঙ্গে নিবিড়ভাবে বাল্যকাল থেকেই জড়িত হন। রাজনীতিতে কংগ্রেস ভাবধারার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থাকার কারণে অসাম্প্রদায়িকভাবে চিন্তাকে সম্প্রসারিত করতে সক্ষম হন এবং এর জন্য বিরুদ্ধ শক্তির নিকট থেকে আমৃত্যু নির্যাতন, যন্ত্রণা নিদারুণভাবে উপহার পেয়েছিলেন। মুসলিম লীগ জন্মগ্রহণ করে সাম্প্রদায়িকতার শক্তিকে কেন্দ্রীভূত করে। মুসলিম লীগের রাজনীতিই এ উপমহাদেশের দীর্ঘদিনের অসাম্প্রদায়িক চিন্তা চেতনায় ফাটল ধরায় যার পরিণতিতে ভারত বিভাগ এবং এর পরবর্তীতে বাংলাদেশের অভ্যুদ্বয়। তিনি মুসলিম লীগের রাজনীতির সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করতে পারেননি। মুসলিম লীগের সংকীর্ণ রাজনীতিকে তিনি পৃষ্ঠপোষকতা দিতে অসমর্থ হয়ে উঠেন। পরিবার থেকেও এর জন্য কোন প্রকার প্রেরণা পাননি। মুসলিম লীগের পরমত অসহিষ্ণুতা তিনি বরদাশত করতেন না। ধর্মীয় কুসংস্কারকে নিয়ে রাজনীতি করাকে তিনি পছন্দ করতেন না। মসজিদের পাশ দিয়ে হিন্দু ধর্মীয়দের বাদ্য বাজনাসহ মিছিল যেতে যখন বাধা আসে তখন তিনি বিষ্ময় প্রকাশ করেন। একদল মিশরীয়দের নিকট থেকে জানতে পারেন সেখান কোন বাধা নেই। কিন্তু ধর্মীয় গোড়াদের দ্বারা আমাদের এতদঞ্চলে এই ইস্যুকে কেন্দ্র করে বহুবার উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে যার মুখোমুখি হয়ে তিনি নাজেহাল হয়েছেন, রক্তাক্ত হয়েছেন। আজও এভাবে তাঁর মত মনমানসিকতা সম্পন্ন মহৎ জনেরা নির্যাতিত হয়েই চলেছেন। নিভৃতচারী এ নেতার জীবনের অনেক তথ্য ও ঘটনা অনেকের কাছেই অজানা রয়ে গিয়েছে। মাস্টার দা সূর্যসেন ফেরারী অবস্থায় তাদের বাসায় অবস্থান করেছিলেন। বিপ্লববাদের প্রতি অকুণ্ঠ সমর্থন ছিল। উন্নত পৃথক মনমানসিকতা সম্পন্ন না হলে এ দুঃসাহসিক কাজে অংশগ্রহণ সম্ভবপর হত না। ১৯৪৭ সালের রেফারেন্ডামে পাকিস্তানের পক্ষে কাজ করেননি। দ্বিজাতি তত্ত্বে বিশ্বাস ছিল না। শেষ পর্যন্ত দ্বিজাতি তত্ত্ব তার অস্তিত্ব রক্ষা করতে পারল না। এগুলো সংকীর্ণ রাজনীতি, এ রাজনীতি অনুদার রাজনীতি, এ অমানতান্ত্রিক রাজনীতি। বর্তমান কিংবা অদূর ভবিষ্যতে সুদূরপ্রসারী ফল নিয়ে আসতে পারে না। মিঃ চৌধূরী তা অনুধাবন করতে পেরেছিলেন বাল্যকাল থেকে গোঁড়ামিমুক্ত, সংষ্কারমুক্ত পারিবারিক পরিবেশে লালিত পালিত হয়ে।
শুধু রাজনীতির ক্ষেত্রে নয় জীবনাচারের অন্যান্য ক্ষেত্রে সংস্কারমুক্ত, অসাম্প্রদায়িক চরিত্রের অধিকারী হিসেবে পরিচিতি অর্জন করেছিলেন। পাকিস্তান আমলে সকল গণতান্ত্রিক আন্দোলনে, সাংস্কৃতিক আন্দোলনে তিনি কখনও অগ্রবর্তী সেনানায়ক, কখনও নেপথের শ্রেষ্ঠ কলাকুশলকার। রবীন্দ্রনাথকে পাকিস্তান আমলে কত বিড়ম্বনার মুখোমুখি হতে হয়েছিল। তাঁর রচনা কূপমুন্ডকতার উর্ধ্বে ছিল বলে পাকিস্তানী শাসক গোষ্ঠী ও তার দোসররা রবীন্দ্র সাহিত্যকে অবহেলা করত, তাচ্ছিল্য করত এমন কী নিষিদ্ধ করার দুঃসাহস ও দেখিয়েছিল। তদানিন্তন পূর্ব পাকিস্তানে, দ্বিজাতি তত্ত্বের সূতিকাগারে যে কয়জন বলিষ্ঠভাবে রবীন্দ্র নামের সাহিত্য, সঙ্গীতকে উর্ধ্বে তুলে ধরার সৈনিক হিসেবে কাজ করেছিলেন মিঃ আমীনূর রশীদ চৌধূরী তাঁদের মধ্যে অন্যতম। রবীন্দ্র চর্চায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিলেন। নিজের বাড়িতে অনুষ্ঠানের আয়োজন করে দৃঢ় মনোবলের পরিচয় দিয়েছিলেন। কাজটা যত সহজ মনে হয় তত চাট্টিখানি কথা নয়। অনেকের রোষানলে, কোপানলে পড়তে হয়েছিল, অনেক প্রকারের নিগৃহিত ও হতে হয়েছিল।
স্বাধীনতাত্তোর বাংলাদেশে তাঁর চারিত্রিক দৃঢ়তার জন্য অনেক ক্ষেত্রেই তাঁর যা পাওয়ার ছিল তা থেকে বঞ্চিত হতে হয়েছিল। তার জন্য তিনি বিন্দুমাত্র বিচলিত হননি। বরঞ্চ যারা অসত্য ও অন্যায় পথে তাকে নিগৃহিত করেছিল তারাই পথচ্যুত, পথভ্রষ্ট হয়েছে, নিজেদের ভুলের শিকারে মর্মাহত হয়েছে।
প্রতিটিকালে কালিক সীমার বাইরে কিছুলোক জন্মগ্রহণ করে সমাজ কাঠামোর ভিত্তিগঠনে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখেন এবং তাঁদের কীর্তি সে সময়ের জন্য অত্যন্ত অপরিহার্য হয়েও উঠে। মিঃ আমীনূর রশীদ চৌধুরী তেমনিভাবে আমাদের আঞ্চলিক সীমার মধ্যেই নয় সারাদেশের মধ্যে নিজস্ব এক বলয় সৃষ্টি করেছেন, ইতিহাস ও ঐতিহ্যের জন্ম দিয়ে গিয়েছেন যা পরবর্তী প্রজন্মের কাছে শিক্ষনীয় ও বন্ধনীয়।
আমাদের বর্তমান সমাজ জীবনের এ ক্রান্তিকালে আমরা যখন নিজস্ব মানবিক স্বকীয়তাকে বিসর্জন দিয়ে অন্য মিথ্যা ভুবন যা একান্তই ক্ষণস্থায়ী রচনায় লিপ্ত হয়েছি তাদের কাজে মিঃ চৌধুরীর জীবনী, কর্মকান্ড, মনমানসিকতা প্রেরণার উৎস হতে পারে। উন্নত চারিত্রিক গুণাবলী সম্পন্ন মানুষের বর্তমানে বড় অভাব, সকলেই রাজনীতির বিষবাষ্পে জর্জরিত। সকল কিছুর মধ্যে রাজনীতিকে লালন করতে গিয়ে শীলিত রাজনীতির অভাব ঘটিয়েছেন। ফলে সকল মহলে শুদ্ধতা স্থান করে দাঁড়াতে পারছে না। আমরা সংকীর্ণতার, অনুদারতার পরিচয় দিয়ে চলেছি। মিঃ আমীনূর রশীদ চৌধূরীর জীবন চর্চা, আদর্শের বিশ্লেষণ সমসমায়িক কালে সবিশেষ প্রয়োজন। শেষের দেশে চলে গেলেও কিছু কিছু লোক আপন মহিমায় উজ্বল ভাস্করের ছাপ রেখে যান, মিঃ আমীনূর রশীদ চৌধুরী তেমনি কালোত্তীর্ণ, যুগোত্তীর্ণ একজন কিংবদন্তীতুল্য জননায়ক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবেন।
সম্পাদক মণ্ডলীর সভাপতি : নূরুর রশীদ চৌধুরী, সম্পাদক : ফাহমীদা রশীদ চৌধুরী, সহকারী সম্পাদক : ফাহমীনা নাহাস
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : অপূর্ব শর্মা