
মিঃ আমীনূর রশীদ চৌধূরীর জীবন ইতিহাস এতই দীর্ঘ, ব্যাপক ও বৈচিত্র্যপূর্ণ যে, স্বল্প পরিসরে তাহা পরিপূর্ণভাবে তুলে ধরা অসম্ভব। মিঃ চৌধূরীর জীবনের এক সংক্ষিপ্ত চিত্র নিম্নে তুলে ধরার চেষ্টা করা হইয়াছে।
মিঃ আমীনূর রশীদ চৌধূরী ১৯১৯ সালের ১৭ই নভেম্বর কলিকাতার ৩১ নম্বর জাননগর রোডে জন্মগ্রহণ করেন। তাহার পিতা মিঃ আব্দুর রশীদ চৌধূরীর নিবাস ছিল সুনামগঞ্জের মহকুমার পাগলা পরগণার অন্তর্গত দুর্গাপাশা গ্রামে। তাদের পূর্বপুরুষ ফুল খান পাঠান মুল্লুক থেকে এখানে এসে বসবাস আরম্ভ করেন। সিলেটের বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব মিঃ আব্দুর রশীদ চৌধূরী বৃটিশ শাসনামলে একষ্ট্রা এসিস্ট্যান্ট কমিশনার, আসাম ব্যবস্থাপক সভার সদস্য, ভারতীয় ব্যবস্থাপক পরিষদের সম্মানিত সদস্য ছিলেন। মিঃ আমীনূর রশীদ চৌধূরীর গর্ভধারিণী ছিলেন মিসেস রাজিয়া রশীদ। মিসেস রাজিয়া রশীদের পূর্ব পুরুষ ইরানের মেশেদ থেকে ভারতে চলে আসতে বাধ্য হন। কারণ তারা ছিলেন সুন্নী এবং ইরানে শিয়াদের প্রাধান্য ছিল অত্যাধিক।
মিঃ আমীনুর রশীদ চৌধূরী তাঁর পিতা-মাতার তৃতীয় সন্তান। তার গর্ভধারিণী মিসেস রাজিয়া চৌধূরী কলিকাতায় কনভেন্ট স্কুল থেকে সিনিয়র ক্যামব্রিজ পরীক্ষা পাশ করেন। তিনি অত্যন্ত সুন্দরী ও মেধাবী ছিলেন এবং ইংরেজী, ফার্সি ও উর্দু ভাষায় কবিতা লিখতেন। মিঃ চৌধূরীর জন্মের তিন মাস পর তাঁর গর্ভধারিণী মায়ের যক্ষ্মা রোগ হয়। রোগটি অত্যন্ত ছোঁয়াচে বলে চিকিৎসকগণ মিঃ চৌধূরীকে তাঁর মার কাছ থেকে সরাইয়া রাখার পরামর্শ দেন। তাঁর মায়ের সহপাঠিনী এক ইংরাজ ভদ্রমহিলা যার নাম মিসেস এ্যালিজাবেথ বেল মিঃ চৌধূরীকে তাঁর মার কাছ থেকে চেয়ে নেন। মিসেস ছিলেন নিঃসন্তান। তাঁর স্বামী মিঃ বেল কলিকাতার তৎকালীন এক বিখ্যাত বাণিজ্য প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং ডাইরেক্টার ছিলেন। ১৯১৯ সালের ১৯ শে জুন চুঁচুড়ার গংগার তীরে একটি বাড়িতে মিঃ চৌধূরীর গর্ভধারিণীর মৃত্যু হয়। তিনি তাঁর গর্ভধারিণীকে স্বজ্ঞানে কোনদিন দেখেননি। তবে মাতৃস্নেহের কোন অভাব হয়নি। প্রথমে মিসেস বেল ও পরে তাঁর আম্মা বেগম সিরাজুন্নেসা চৌধূরী (বেগম রশীদ) তাঁকে মাতৃস্নেহের অভাব বোধ করতে দেননি। বেগম সিরাজুন্নেসা চৌধূরী পাকিস্তান আমলে এম.এন.এ ছিলেন। ত্রিশ ও চল্লিশ দশকে সিলেটের সহিংস ও অহিংস রাজনৈতিক আন্দোলনে বেগম রশীদের অবদান ছিল অতুলনীয়।
বেল দম্পতির কাছে থাকায় মিঃ চৌধূরীর মুখে ফুটেছে ইংরেজী ভাষা। দশ বারো বছর বয়স পর্যন্ত অন্য ভাষায় কথা বলতে শিখেননি। মিঃ চৌধূরীর শিক্ষা আরম্ভ হয় ক্যালকাটা বয়েজ স্কুলে। এদিকে মিঃ বেলের ভারতবর্ষে কাজের মেয়াদ শেষ হয়ে গেলে মিসেস বেলের ইচ্ছে হলো মিঃ চৌধূরীকে তাদের সঙ্গে বিলেত নিয়ে যেতে। কিন্তু মিঃ চৌধূরীর আত্মীয়-স্বজনের আপত্তিতে তা আর হলো না।
ছাত্র জীবনেই মিঃ চৌধূরী স্বাধীনতা সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েন। আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে এক ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে তার শিক্ষা পর্বের সমাপ্তি ঘটে। একজন স্বাধীনতা সংগ্রামী হিসেবে তার অবদান অবিস্মরণীয়। তিনি যে সময় রাজনীতি করেছেন সে সময় ফুলের মালা ও জিন্দাবাদ ছিল না। ছিল জেল, জরিমানা, ফাঁসি। স্বাধীনতা সংগ্রামে মিঃ চৌধূরী সহিংস ও অহিংস উভয় পন্থায় অংশ নিয়েছেন প্রত্যক্ষভাবে। নেতাজী সুভাষ বসু ও চট্টগ্রামের মাস্টারদা’র আদর্শ তার উপর প্রভাব ফেলেছিল। তিনি সুভাষ বসুর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শে এসেছিলেন। অবিভক্ত ভারতবর্ষ স্বাধীনতা সংগ্রামে তার কয়েক দফায় কারাদন্ড হয়েছে। কারাযন্ত্রণা ভোগ করা ছাড়াও অন্যান্য বহুভাবে মিঃ চৌধূরী নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে তাঁহার মত ত্যাগী পুরুষের বা বীরের নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। মিঃ চৌধূরী তাঁহার আত্মজীবনী গ্রন্থে লিখেছেন, ‘জেল খেটেছি, পুলিশের সন্দেহভাজন হয়েছি। একবার এদের খাতায় নাম লেখা হয়ে গেলে তা আমরণ থেকে যায়। এককালে যা যা করেছি তার কয়েকটির জন্য ফাঁসি হতে পারত ইংরেজদের বিচারে, কিন্তু গ্রহের ফেরে আজও স্বাধীন দেশে বেঁচে আছি। রাজনীতিতে প্রবেশের পিছনে অন্যান্যরা ছাড়া মৌলভী রিয়াজুদ্দীনের অনুপ্রেরণা ছিল সবচাইতে বেশি।
রাজনৈতিক জীবনে মিঃ আমীনূর রশীদ চৌধূরী এই উপ-মহাদেশের বিশিষ্ট রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শে এসেছিলেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন মহাত্মা গান্ধী, মিঃ জিন্নাহ, নেতাজী সুভাষ বসু, পন্ডিত নেহেরু, মাওলানা আবুল কালাম আজাদ, ফখরুদ্দীন আলী আহমদ (রাষ্ট্রপতি), ভি.ভি.গিরি (রাষ্ট্রপতি), খান আব্দুল কাইয়ুম খান, মিঃ ফিরোজ খান নূন, চৌধূরী খালিকুজ্জামান, ডা. বিধান রায়, আসামের প্রাক্তন মূখ্যমন্ত্রী সৈয়দ স্যার সাদুল্লাহ, মিঃ গোপীনাথ বড় দলই, জননেতা মিঃ টি আর পুকন, মিঃ নবীনচন্দ্র বড়দলই, মিঃ দেবেশ্বর শর্মা, মিঃ কে চান্দ, মিঃ আব্দুল মতিন চৌধূরী প্রমুখ। এছাড়া আরো বহু বিশিষ্ট রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব রয়েছেন যাদের পরিচিতি সারা উপ-মহাদেশে ছড়িয়ে আছে। মিঃ চৌধূরীর সাথে তাদের ব্যক্তিগত পর্যায়ে পরিচিতি ছিল। তাঁদের অনেকে সিলেটে তাঁর বাড়িতে আতিথ্য গ্রহণ করেছেন। বৃটিশ ভারতে রাজনৈতিক জীবনে তিনি তৎকালীন বৃটিশ রাজ প্রতিনিধি ও গভর্ণর জেনারেলের অতিথিও হয়েছিলেন। রাজনৈতিক জীবনে কংগ্রেসের সাথে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর বলতে গেলে তিনি সক্রিয় রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করেননি। তিনি টুলটিকর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানও ছিলেন।
মিঃ আমীনূর রশীদ চৌধূরীর জীবনে রাজনৈতিক দিক ছাড়াও সামাজিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও সেবামূলক দিকগুলি উজ্জ্বলতায় ভরপুর। তাঁর মানবিক গুণাবলী, তার প্রতিভা, মেধা, সাহস ও বুদ্ধি তাকে সকল ক্ষেত্রে মহান করেছে। সাংবাদিকতা ক্ষেত্রে তার অবদান উজ্জ্বল হয়ে থাকিবে। প্রকৃতপক্ষে তার সাংবাদিকতা শুরু ১৯৩৪ সালে। সে সময়ে সিলেটের এ্যাডিশনেল ডিষ্ট্রিক্ট ম্যাজিষ্ট্রেটের কোর্টে একটি বিখ্যাত মামলার খবর সংগ্রহ থেকে তার সাংবাদিকতা শুরু। মিঃ চৌধূরীর ভাষায় : ‘আমি গেলাম যুগভেরীর সম্পাদক মিঃ মকবুল হোসেন চৌধূরীর কাছে। বললাম, আমাকে কোর্টে পাঠাবার ব্যবস্থা করে দিতে, কারণ ঐসব মামলায় বাহিরের কাউকে ভিতরে যেতে দেওয়া হত না। যুগভেরীর সম্পাদক আমাকে যুগভেরীর প্যাড দিয়ে বললেন, ‘কি লিখতে হবে তুমি ঠিক করে আন।’ আমাকে যুগভেরীর প্রতিনিধি হিসেবে কোর্টে হাজির থাকার অনুমতি দেবার জন্য লিখে তাঁর দস্তখত নিলাম এবং এ.ডি.এম এর নিকট উপস্থিত হলাম। জীবনের প্রথম সাংবাদিকতা করতে গেলাম। সাংবাদিকতা ঠিকই করেছিলাম। মিঃ মকবুল হোসেন চৌধূরী আমার রিপোর্ট দেখে বলেছিলেন, ‘তুমি ইচ্ছে করলে রিপোর্টার হতে পারবে, তোমার হাত আছে।’
১৯৩১ সালে মিঃ আব্দুর রশীদ চৌধূরী কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত ‘যুগভেরী’র নামটা মিঃ আমীনূর রশীদ চৌধূরীর দেয়া। তিনি ‘যুগভেরী’ পত্রিকার যুগ ও ‘রণভেরী’ নামে শিশুপাট্য বইয়ের ‘ভৈরী’ নিয়ে যুগভেরী নামকরণ করেছিলেন।
যুগভেরীর সাথে মালিক ও সম্পাদক হিসেবে তার জীবন শুরু হয় ১৯৬১ সাল থেকে। ‘ইষ্টার্ণ হেরাল্ড’ নামের একটা ইংরেজি পত্রিকাও তিনি বের করেছিলেন যা অবশ্য বর্তমানে নেই। যুগভেরী তার মালিকানা ও সম্পাদনায় আসার পর তার মর্যাদা ও প্রভাব আরো বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রকৃতপক্ষে যুগভেরী থেকে কোন লাভ হয় না। মিঃ চৌধূরী তার অন্যান্য আয় থেকে অর্থ ব্যয় করে যুগভেরী দীর্ঘদিন ধরে টিকিয়ে রেখেছেন বা রাখছেন। যুগভেরী তার সম্পাদনায় সত্যিকার অর্থে সিলেটের আশা-আকাক্সক্ষার প্রতীক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। মিঃ চৌধূরী সিলেটের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে যখনই যা লেখার প্রয়োজন মনে করেছেন তা লিখেছেন- কোন হুমকি, কোন রক্তচক্ষু, কোন প্রলোভন তাকে দমাতে পারেনি। সত্য ও বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতায় তার ভূমিকা উজ্জ্বল। সম্পাদককালীন জীবনে তিনি বহুবার বিব্রতকর অবস্থার সম্মুখীন হয়েছেন। কিন্তু সাংবাদিকতার স্বার্থে, জেলার বৃহত্তম স্বার্থে তিনি হাসিমুখে তা সামলে নিয়েছেন।
সিলেটের সাহিত্য-সাংস্কৃতিক জগতে তার পদচারণা বা অবস্থা অত্যন্ত উজ্জ্বল। সিলেট মুসলিম সাহিত্য সংসদের জন্মকাল থেকে তিনি ইহার সাথে জড়িত ছিলেন। সিলেট মুসলিম সাহিত্য সংসদের সভাপতি হিসেবে তার ভূমিকা ছিল সত্যি প্রশংসনীয়। তিনি সাহিত্য সংসদের পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন দীর্ঘদিন। সাহিত্য সংসদের বহু মূল্যবান পুস্তক সংগ্রহে তার ভূমিকা ছিল অনন্য। তার কাব্য ও সংগীত প্রতিভাও উল্লেখ করার মতো। তিনি রেডিও বাংলাদেশের একজন নিয়মিত গীতিকার ছিলেন। তার লেখা বহু গান রেডিও পাকিস্তান ও রেডিও বাংলাদেশ থেকে প্রচারিত হয়েছে। ‘গানের ডালি’ নামে তার লেখা গানের একটা বই প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়া আরো অসংখ্য গান লিখেছেন।
মিঃ আমীনূর রশীদ চৌধূরীর জীবনের উল্লেখযোগ্য অংশ কাটিয়েছে কবি-সাহিত্যিক ও শিল্পীদের ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শে। কবি কাজী নজরুল ইসলাম, তারা শংকর, বনফুল, সজনীকান্ত দাস প্রমুখের ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্য তিনি লাভ করেছেন। এছাড়া আরো বহু সাহিত্য সংগীত প্রতিভার সাথে তার অন্তরঙ্গ সম্পর্ক হইয়াছে। তাদের পরিচিতি সাহিত্য জগতে দেদীপ্যমান। প্রখ্যাত ভাষাবিদ ও পন্ডিত সৈয়দ মুজতবা আলীর সঙ্গে সম্পর্ক ছিল খুবই ঘনিষ্ঠ। বিশিষ্ট কবি বেগম সুফিযা কামাল তাকে বোনের অকৃপণ স্নেহ দিয়ে আসছিলেন।
মিঃ চৌধূরীর বাসভবন আম্বরখানার জ্যোতি মঞ্জিল সিলেট শহরের সংস্কৃতি চর্চার এক বিশিষ্ট কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। নববর্ষ বা রবীন্দ্র-নজরুল জন্মবার্ষিকীতে তাদের বাড়িতে প্রায় প্রতি বছরই সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। তাদের গোটা পরিবার সংস্কৃতি চর্চায় উৎসাহী। মিঃ চৌধূরী ‘সিলেটী নাগরী লিপি’ সাহিত্যের উন্নয়নে যথেষ্ট অবদান রেখে গিয়েছেন। প্রতœতাত্ত্বিক নিদর্শন সংগ্রহে তার প্রচেষ্টা প্রশংসনীয়। তারই প্রচেষ্টায় সিলেটে কয়েকটি প্রাচীন তাম্রালিপি ও শিলালিপি উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। এছাড়া সাহিত্য-সাংস্কৃতিক ও সাংবাদিকতা ক্ষেত্রে তার বহু ধরনের প্রশংসনীয় তৎপরতা রয়েছে। তিনি সিলেট প্রেসক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। দীর্ঘ কয়েক বছর তিনি প্রেসক্লাবের সভাপতি ছিলেন। এছাড়া তিনি বাংলাদেশ সরকারের তথ্য মন্ত্রণালয়ের সংবাদপত্র হিসেবে তিনি বিদেশ সফল করেছেন। সর্বশেষ সফর করেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সাথে যুগোশ্লোভিয়া।
মিঃ আমীনূর রশীদ চৌধূরী অন্যান্য পত্রিকার সাথে কলকাতার বিখ্যাত সাপ্তাহিক ‘দেশ’ পত্রিকায় লিখতেন। কলিকাতার ‘বারো মাস’ তার আত্মজীবনী প্রকাশের উদ্যোগ নিয়েছে। তিনি রেডিও বাংলাদেশ সিলেট কেন্দ্রের উপদেষ্টা কমিটির সদস্য ছিলেন।
একজন চা-কর হিসেবে তার ব্যাপক পরিচিতি রয়েছে। তিনি একজন প্রবীণ চা-বিশেষজ্ঞ। চা সম্পর্কে নবাগতরা তার মূল্যবান পরামর্শ পেয়ে থাকেন। তিনি নূরজাহান ও আমীনাবাদ চা বাগানের সত্ত্বাধিকারী। পাকিস্তান টি এসোসিয়েশনের তিনি ভাইস চেয়ারম্যান ছিলেন। পরে তিনি বাংলাদেশীয় চা সংসদের ভাইস চেয়ারম্যান ছিলেন। তিনি পাকিস্তান ন্যাশনাল টি এসোসিয়েশনের প্রতিষ্ঠা অবৈতনিক সেক্রেটারী ছিলেন। এছাড়া ছিলেন টি বোর্ডের মেম্বার। তিনি বাংলাদেশ চা শ্রমিক প্রভিডেন্ট ফান্ডের অন্যতম ট্রাস্ট্রি ছিলেন। বাংলাদেশ রেলওয়ে এডভাইসারী কাউন্সিলের তিনি সদস্য (বাংলাদেশীয় চা সংসদের প্রতিনিধি হিসেবে) ছিলেন।
তিনি তিনবার জেনিভায় আই.এল.ও কমিটি অন ওয়ার্কস অন প্ল্যান্টেশন-এ পাকিস্তানের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। তিনি ছিলেন এমপ্লয়ার্স গ্র“পের প্রতিনিধি। একবার সম্মেলনে তাকে এমপ্লয়ার্স গ্র“পের ভাইস চেয়ারম্যান করা হয়।
বাংলাদেশ স্বাধীনতা যুদ্ধে মিঃ চৌধূরীর অবদান অবিস্মরণীয়। তিনি ৭১ সালের মার্চ-এপ্রিল মুক্তিযুদ্ধের জন্যে চা-বাগান সমূহ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ চাঁদা তুলে দিয়েছেন। পাক হানাদার বাহিনী মিঃ চৌধূরীকে বন্দী করে সালুটিকরের নিকটবর্তী তৎকালীন সিলেট আবাসিক বিদ্যালয়ের বন্দী ১৩০ দিন আটক করে রাখে এবং তার উপর অমানুষিক নির্যাতন করে। এ নির্যাতনের ফলে মিঃ চৌধূরী শারীরিক দিক থেকে ভেঙে পড়েন। বন্দিদশা থেকে মুক্তি পেয়ে তিনি স্বপরিবারে বিলাতে চলে যান এবং সেখানে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষে কাজ করেন। সে সময়ে কলিকাতার দেশ পত্রিকায় তার লেখা পাক নির্যাতনের বিবরণ প্রকাশিত হয় যা সে সময় তুমুল আলোড়ন সৃষ্টি করে। এছাড়া স্বাধীনতা সংগ্রামে তাঁর বিপুল পরিমাণ সম্পত্তির ক্ষতি সাধিত হয়।
মিঃ চৌধূরীর সবচেয়ে বড় গুণ তিনি একজন দানশীল। তার দান নীরবে, গোপনে- যা একজন প্রকৃত দানশীলের বৈশিষ্ট্য। তার দানে বহু ব্যক্তি উচ্চশিক্ষিত হয়েছেন। তিনি মেধাবী ও গরীব ছাত্রদের নিয়মিত বৃত্তি দিয়ে থাকেন এবং এই খাতে বছরে হাজার হাজার টাকা ব্যয় হয়। তিনি রোগীর সেবায়, আর্ত মানবতার সেবায় সাহিত্য-সংস্কৃতির সেবায়, দুঃস্থ শিল্পী-সাহিত্যিকদের সেবায় সর্বদা অগ্রভাগে থাকেন। তার মত দানশীল ব্যক্তি আমাদের সমাজে দুর্লভ।
ধর্মীয় ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলি তার আর্থিক সাহায্য পেয়ে থাকে। তিনি রেডক্রসের আজীবন সদস্য ছিলেন। শ্রীমঙ্গলে শেফা ওয়েলফেয়ার ট্রাস্টের প্রস্তাবিত হাসপাতালে তিনি লক্ষাধিক টাকা দান করেছিলেন। এছাড়া সিলেট শহরের চৌহাট্টায় এক খন্ড মূল্যবান ভূমি শেফা ওয়েলফেয়ার ট্রাস্টকে দান করেছিলেন যেখানে বর্তমান লায়ন শেফা ফ্রি ক্লিনিক পরিচালিত হয়। সম্ভবত: শিক্ষাখাতে তার দান সর্বাধিক। ছাত্র বৃত্তি ছাড়াও বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে তিনি আর্থিক ও অন্যান্য ধরনের সাহায্য দিয়ে থাকেন। তিনি সিলেট মহিলা কলেজ ও মদন মোহন কলেজ পরিচালনা কমিটির সদস্য ছিলেন। দেশ বিভাগের পর মহিলা কলেজ যখন সরকারী থেকে বেসরকারী প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়ে ধ্বংসের দিকে এগিয়ে গেলে তখন মিঃ চৌধূরীসহ কয়েকজনের প্রচেষ্টায় কলেজটির অস্তিত্ব রক্ষা পায়।
মিঃ চৌধূরী লায়ন্স ক্লাব অব সিলেটের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন। তিনি সিলেট স্টেশন ক্লাবের আজীবন সদস্য ছিলেন। এছাড়া তিনি লাক্কাতুড়া গলফ ক্লাব, বালিশিরা ক্লাব ও জুরি লংকা ক্লাবের সদস্য ছিলেন। তিনি ছিলেন গলফ খেলায় পারদর্শী। মিঃ চৌধূরীর এক সমৃদ্ধ ব্যক্তিগত পাঠাগার রয়েছে যেখানে দেশ-বিদেশের প্রাপ্য বইয়ের সমাবেশ ঘটিয়েছিলেন। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় তার পাঠাগারে ব্যাপক ক্ষতি সাধিত হয় এবং অনেক বই চুরি হয়ে যায়। জ্ঞান পিপাসু মিঃ চৌধূরীর অধিকাংশ সময় কাটত পড়াশুনায়।
মিঃ আমীনূর রশীদ চৌধূরী একজন বিশিষ্ট ফটোগ্রাফার বা চিত্রগ্রাহক হিসেবে পরিচিত। তার নিজের ভাষায় ‘১৯২৪ সালে আমার নবম জন্মদিনে আমাকে একটি টু, সি বক্স ব্রউনি ক্যামেরা উপহার দেন এবং ফটো তোলার প্রাথমিক সব কিছু শিখিয়ে দেন। এই ক্যামেরা দিয়ে বহু ছবি তুলেছি। পরবর্তীকালে রোলী ফ্লক্স, ফোন্টাফ্লেক্স, ক্যানন ইত্যাদি বহু উচ্চ মূল্যের ক্যামেরা কিনে ব্যবহার করেছি। কিন্তু আজও মনে হয় যেন সেই বক্স ক্যামেরায় তোলা ছবির তুল্য ছবি তুলতে পারিনি। এককালে আমি সন্তোষ কুমার, রবীন রায়, কোলকাতার শম্ভু সাহা, বোম্বের হাবিব ইব্রাহিম রহমত উল্লা (ইনি পরবর্তীকালে লন্ডনে পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূত নিযুক্ত হয়েছিলেন) এ.জে প্যাটেল, হায়দরাবাদের রাজা দীন দয়াল, পালানপুর স্টেইটের একে সঈদ প্রমুখ ব্যক্তিদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ছবি তুলতাম। সারা ভারতবর্ষে এমনকি পৃথিবীর বহু জায়গায় আমার তোলা ছবি নিয়ে যেতেন এবং মাঝে মাঝে এক একটি ছবির জন্য উচ্চমূল্য তো পেতাম।’
এ তথ্য হয়তো অনেকেরই জানা নেই যে, মিঃ আমীনূর রশীদ চৌধূরী চলচ্চিত্রের চিত্র গ্রহণ করেছেন। তিনি পৃথিবীর বহু দেশে ভ্রমণ করেছেন এবং বিচিত্র অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন। তার বহু বিদেশী বন্ধু রহিয়াছে। ঢাকায় অবস্থানরত বিভিন্ন দেশের মাননীয় রাষ্ট্রদূত তাকে বাসভবনে আতিথ্য গ্রহণ করেছেন।
সম্পাদক মণ্ডলীর সভাপতি : নূরুর রশীদ চৌধুরী, সম্পাদক : ফাহমীদা রশীদ চৌধুরী, সহকারী সম্পাদক : ফাহমীনা নাহাস
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : অপূর্ব শর্মা