
সিলেট-১ আসনে এবারও নৌকার কান্ডারি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. একে আব্দুল মোমেন। মর্যাদাপূর্ণ এই আসনে আরও ৪ জন প্রার্থী হলেও তারা মোমেনের সাথে তেমন কোন প্রতিদ্বন্দ্বিতাই গড়ে তুলতে পারবেন না বলে ধারণা করা হচ্ছে। প্রচারেও তেমন সরব ছিলেন না ভোটারদের কাছে অনেকটাই পরিচিত এই প্রার্থীরা। ফলে অনেকটা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায়ই দ্বিতীয়বারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হতে যাচ্ছেন ড. মোমেন।
মোমেনের মতো সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছেন সিলেট বিভাগের অন্য তিন মন্ত্রীও। সিলেট-৪ আসনে প্রবাসীকল্যান ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী, মৌলভীবাজার-১ আসনে পরিবেশ মন্ত্রী শাহাব উদ্দিন এবং সুনামগঞ্জ-৩ আসনে পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নান সহজেই জয় পেতে যাচ্ছেন বলে মনে করছেন এসব আসনের ভোটাররা। শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বি না থাকায় অনেকটাই নির্ভার এই মন্ত্রীরা।
এছাড়া বিভাগের ১৯ আসনের মধ্যে নৌকার আরও অন্তত ৩ প্রার্থীর জয় ভোটের আগেই অনেকটা নিশ্চিত বলে ধারণা করা হচ্ছে। মৌলভীবাজার-২ আসনে জিল্লুর রহমান, মৌলভীবাজার-৪ আসনে সাবেক চিফ হুইপ উপাধ্যক্ষ আব্দুস শহিদ এবং হবিগঞ্হ-৩ আসনে আবু জহিরের অনেকটা সহজেই জয় পেতে পারেন।
তবে ঝুঁকিতে রয়েছেন বিভাগে নৌকার ১১ প্রার্থী। তাদের আসনে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতার আভাস পাওয়া গেছে। নৌকার কয়েকজন প্রার্থীকে পরাজয়ের স্বাদও পেতে হতে পারে। এই ১১ আসনের বেশিরভাগটিতেই নৌকার হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছেন আওয়ামী লীগের মনোনয়নবঞ্চিত স্বতন্ত্র প্রার্থীরা।
সিলেট বিভাগের ১৯টি আসনের মধ্যে ১টি আসনে জাতীয় পার্টিকে ছাড় দিয়েছে আওয়ামী লীগ। নবীগঞ্জ-১ আসনে জাতীয় পার্টির প্রার্থী এম এ মুনিম চৌধুরী বাবুকে ছাড় দিয়েছে ক্ষমতাসীন দল। এখানে প্রার্থীতা প্রত্যাহার করে নিয়েছেন আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন পাওয়া ডা. মুশফিকুর রহমান চৌধুরী।
সিলেট জেলা: জেলার ৬ টি আসনের মধ্যে সিলেট-১ এবং সিলেট-৪ আসনে ড. একে আব্দুল মোমেন এবং ইমরান আহমদের জয় প্রায় নিশ্চিত। তবে বাকী ৪ আসনে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতার আভাস পাওয়া গেছে। এরমধ্যে ৩ টিতেই ঝুঁকিতে রয়েছেন নৌকার প্রার্থী।
সিলেট-২ আসনে এবার নৌকা প্রতীকে লড়ছেন সাবেক এমপি শফিকুর রহমান চৌধুরী। এখানে শফিকুর রহমানের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে গণফোরামের প্রার্থী বর্তমান এমপি মোকাব্বির খান ও জাতীয় পার্টির সাবেক এমপি এহিয়া চৌধুরী আছেন। তবে এ আসনে শফিকের সাথে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হতে পারে আদালতের নির্দেশে শেষ সময়ে মনোনয়ন ফিরে পাওয়া মুহিবুর রহমানের। আওয়ামী লীগের মনোনয়বঞ্চিত বিশ্বনাথ পৌরসভার মেয়র মুহিবুর রহমানের শক্ত ভোট ব্যাংক রয়েছে এলাকায়। তবে এ আসনে শফিকুর রহমানই শেষ হাসি হাসতে পারেন বলে জানিয়েছেন একাধিক ভোটার।
তবে বিপরীত চিত্র সিলেট-৩ আসনে। এ আসনে নৌকার প্রার্থী, বর্তমান সংসদ সদস্য হাবিবুর রহমানকে ঝুঁকিতে ফেলে দিয়েছেন আওয়ামী লীগের মনোনয়নবঞ্চিত হয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়া বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) মহাসচিব ডা. এহতেশামুল হক চৌধুরী দুলাল। এ ছাড়া এখানে জাতীয় পার্টির প্রার্থী আতিকুর রহমান আতিকও প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলতে পারেন।ভোটারদের কেন্দ্রে নিয়ে আসতে পারলে এ আসনে দুলালের জয়ের সম্ভাবনাই বেশি বলে জানিয়েছেন ভোটাররা।
সিলেট-৫ ও ৬ হিসেবে হিসেব এবার বেশ কঠিন। এই দুই আসনেই দলীয় স্বতন্ত্র প্রার্থীর পাশপাশি ‘সরকারের বিশেস নজরে থাকা’ প্রার্থীরাও নৌকার প্রার্থীর বিজয়ের পথে কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছেন। ফলে এই দুই আসনে ত্রিমূখী লড়াইয়ের আশা করা হচ্ছে। সিলেট-৫ আসনে নৌকার প্রার্থী বীর মুক্তিযোদ্ধা মাসুক উদ্দিনের বিপরীতে ভোটে লড়ছেন আওয়ামী লীগের স্বতন্ত্র প্রার্থী ড. আহমদ আল কবির। এছাড়া স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন ধর্মভিত্তিক সংগঠন আঞ্জুমানে আল ইসলাহর মহাসচিব হুছামুদ্দীন চৌধুরী। হুছামুদ্দীনকে সরকার বিশেষ সুবিধা প্রদান করছে বলে অভিযোগ করেছেন এখানকার অন্য প্রার্থীরা।
সিলেট-৬ আসনে নৌকার প্রার্থী সাবেক শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদের সাথে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে লড়ছেন কানাডা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি সারওয়ার হোসেন। এ ছাড়া তৃণমূল বিএনপির চেয়ারম্যান ও সাবেক কূটনীতিক শমসের মুবিন চৌধুরীও এখানে প্রার্থী হয়েছেন। এই আসনে ত্রিমূখী লড়াইয়ের ধারণা করা হচ্ছে। তবে শমসের মুবিনের সাথে সরকারের সমঝোতা হতে পারে বলেও গুঞ্জন রয়েছে। শমসের মুকিন এবং হুছামুদ্দীনের পক্ষে আওয়ামী লীগের অনেক নেতাকর্মীও প্রচারণায় সক্রিয় ছিলেন।
সুনামগঞ্জ জেলা: সুনামগঞ্জ-৩ আসনে পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নানের সাথে লড়াইয়ে রয়েছেন তৃণমূল বিএনপির প্রার্থী ও এই এলাকার সাবেক সংসদ সদস্য মাওলানা শাহীনুর পাশা। নির্বাচনের আগে প্রধানমন্ত্রীর সাথে সাক্ষাত করায় শাহীনুরকে অব্যাহতি প্রদান করে তার দল জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম। ফলে জমিয়ত এবং এই ধারার ভোটগুলো শাহীনুরের বাক্সে এবার নাও পড়তে পারে। এতে করে অনায়াসেই জয় পেতে পারেন মান্নান।
সুনামগঞ্জ-১ আসনে নৌকার প্রার্থী সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট রণজিত সরকারের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন আওয়ামী লীগের মনোনয়নবঞ্চিত মোয়াজ্জেম হোসেন রতন ও সুনামগঞ্জ জেলা শ্রমিক লীগের সভাপতি সেলিম আহমদ। রতন এই এলাকার নৌকা প্রতীকের টানা তিনবারের এমপি। ফলে তার রয়েছে বড় ভোটব্যাংক। রতনের কারণে বেগ হতে হচ্ছে নৌকার নতুন মুখ রঞ্জিতকে।
সুনামগঞ্জ-২ আসনেও একই চিত্র। এই আসনে এবার নৌকার নতুন মুখ আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ ওরফে আল আমিন চৌধুরী। তার বিপরীতে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন বর্তমান এমপি জয়া সেনগুপ্ত। জয়া প্রয়াত জাতীয় নেতা সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের স্ত্রী। সুরঞ্জিত এই আসনের ৬ বারেরর সংসদ সদস্য। সুরঞ্জিতের মৃত্যুর পর তার স্ত্রী এই এলাকা থেকে দুবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ফলে সুনামগঞ্জ-২ সুরঞ্জিতের আসন হিসেবে পরিচিত। সুরঞ্জিতের ব্যক্তি ইমেজ আর এলাকাভিত্তিক ইজমের কারণে এখানে আওয়ামী লীগের প্রার্থী, পুলিশ প্রধানের ভাই আল আমিন কঠিন চ্যালেঞ্জে পড়েছেন।
সিলেট বিভাগের মধ্যে একমাত্র সুনামগঞ্জ-৪ আসনে নৌকা-লাঙ্গলের শক্ত লড়াই হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এখানে নৌকার প্রার্থী পিএসসির সাবেক চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ সাদিক। গত দুই নির্বাচনে এই এলাকা থেকে আওয়ামী লীগের সমর্থনে বিজয়ী হন জাতীয় পার্টির প্রার্থী পীর ফজলুর রহমান মিসবাহর। এবারও লাঙ্গল প্রতীক নিয়ে প্রার্থী হয়েছেন তিনি। সাদিকের জন্য কঠিন চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছেন মিসবাহ।
সুনামগঞ্জ-৫ আসনে নৌকার প্রার্থী মুহিবুর রহমান কঠিন চ্যালেঞ্জে পড়েছেন আওয়ামী লীগের মনোনয়ন বঞ্চিত হয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়া শামীম আহমদ চৌধুরীর কারণে।
হবিগঞ্জ জেলা: হবিগঞ্জ-১ আসন মহাজোটের প্রার্থী জাতীয় পার্টি নেতা এম এ মুনিম চৌধুরী বাবু। এখানে নৌার প্রার্থী না থাকলেও মুনিমকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী, আওয়ামী লীগের সাবেক এমপি আমাতুল কিবরিয়া কেয়া চৌধুরী। কেয়ার কারণে মুনিম চৌধুরীর জন্য বিজয় কঠিন হয়ে উঠতে পারে এখানে।
হবিগঞ্জ-২ আসনে নৌকার নবীন প্রার্থী ময়েজ উদ্দিন রুয়েল বিপাকে পড়েছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়া আওয়ামী লীগ দলীয় বর্তমান এমপি আব্দুল মজিদ খানের কারণে। টানা তিনবারের এমপি মজিদ খানের শক্ত অবস্থান রয়েছে এখানে। ফলে কঠিন লড়াইয়ের মুখোমুখি হতে হচ্ছে তরুণ রুয়েলকে।
সিলেট বিভাগের চার মন্ত্রী সুবিধাজনক অবস্থানে থাকলেও বিপাকে আছেন হবিগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য, বিমান ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী মাহবুব আলী। এবারও আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়েছেন তিনি। এখানে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন যুবলীগের সাবেক আইন সম্পাদক ব্যারিস্টার সায়েদুল হক সুমন। সোশ্যাল মিডিয়ায় জনপ্রিয় সুমন দীর্ঘদিন ধরেই এলাকায় সক্রিয়। ফলে মাহবুব আলীকে কঠিন লড়াইয়ের মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
মৌলভীবাজার জেলা: এই জেলার ৪ টি আসনের মধ্যে ৩ টিতেই নৌকার জয় প্রায় নিশ্চিত হলেও মৌলভীবাজার-২ আসনে ঝুঁকিতে রয়েছেন আওয়ামী লীগের প্রার্থী। এ আসনে নৌকার প্রার্থী হয়েছেন কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক সফিউল আলম চৌধুরী নাদেল। এখানে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন কুলাউরা উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ নেতা এ কে এম সফি আহমদ সলমান। এছাড়া তৃণমূল বিএনপির প্রার্থী হয়েছেন সাবেক এমপি এম এম শাহীন। মৌলভীবাজার-২ ত্রিমুখী লড়াই হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সংবাদটি ভালো লাগলে স্যোশাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন