:: 28-11-2020  
menu
(পরীক্ষামূলক সম্প্রচার)

হারিয়ে যাচ্ছে গোলাপগঞ্জের মৃৎশিল্প

নিজস্ব সংবাদদাতা, গোলাপগঞ্জ : আধুনিকতার ছোঁয়ায় হারিয়ে যাচ্ছে গোলাপগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী মৃৎশিল্প। এক সময়ের দৈনন্দিন ব্যবহার্য জনিসপত্রের মধ্যে শতভাগই ছিল কুমারের হাতের তৈরি জিনিসপত্র। কালের বিবর্তনে মানুষের রুচির পরিবর্তনের ফলে মাটির তৈরি থালা, বাসন, হাড়ি, পাতিল, ঘটি-বাটি, ইত্যাদি সামগ্রীর স্থান দখল করে নিয়েছে প্লাস্টিক, মেলামাইন, স্টিল ও অ্যালুমিনিয়ামের তৈরি আধুনিক সামগ্রী। মৃৎশিল্পের চাহিদা কম, কাঁচামালের উর্ধ্বম‚ল্য, পুঁজির অভাব এসব নানা সমস্যায় জর্জরিত হয়ে আধুনিক শিল্পের সাথে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে না পেরে বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে গোলাপগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী মৃৎশিল্প।

News image

ইতিহাস ঐতিহ্যের পাতায় গোলাপগঞ্জের মৃৎশিল্প সমগ্র সিলেট অঞ্চলে সমাদিত ছিল। আধুনিকতার ছোঁয়ায় বিলুপ্ত প্রায় মৃৎশিল্পের অস্তিত্ব কিছুদিন পরে জাদুঘরেই স্থান পাওয়ার উপক্রম। জীবিকার তাগিদে গোলাপগঞ্জের কুমারেরা পূর্ব পুরুষের ঐতিহ্যের ধারক মৃৎশিল্পের কাজ ছেড়ে পেশা বদল করে অনেকে পাড়ি জমাচ্ছেন সুদুর প্রবাসে আর কেউবা কৃষিকাজ, মিস্ত্রিকাজে নিজেকে নিয়োজিত রেখে জীবিকাহ নির্বাহ করছেন। আবার কেউ কেউ নিজস্ব ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখতে ¯্রােতের বিপরীতে সংগ্রাম করে এখনও মৃৎশিল্পকে আঁকড়ে ধরে টিকে আছে এ উপজেলার গুটিকয়েক পরিবার। 

উপজেলার পৌর এলাকার ঘোষগাঁও কুমারপাড়া, ঢাকাদক্ষিণ ইউপির পূর্ব খর্দ্দাপাড়া (পাত্তন), লক্ষণাবন্দ ইউপির চক্রবর্ত্তীপাড়া, বাঘা ইউপির কান্দিগাঁও এলাকায় শত বছর ধরে মূলত পাল সম্প্রদায়ের কুমার পরিবারগুলোর বাসবাস। সরজমিন উপজেলার ঘোষগাঁও কুমার শিল্পগুলো ঘুরে মৃৎকারিগর দের সাথে আলাপচারিতায় তাদের দূর্দিনের খবর জানা যায়। সেখানে পাল সম্প্রদায়ের ৩৪/৩৫টি পরিবারের বসবাস। কিন্তু কুমার পাড়ায় এখন নেই আগের মতো মৃৎশিল্প কর্মকেন্দ্রিক ব্যস্ততা। মাড় ঘর আর চাকতি নিয়ে নেই কোন প্রাণচঞ্চলতা। 

অনিশ্চিত ভবিষ্যতের কারণে গত ৪/৫বছর ধরে ধীরে ধীরে এ পেশা থেকে নিজেদের গুটিয়ে নিয়েছেন উপজেলার বেশিরভাগ কুমারেরা। হয়তো বা এমন দিন আসবে এ পেশার অস্তিত্ব মিলবে না। শুধুমাত্র খাতা-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকবে এই মৃৎশিল্পের নাম এরকমই আবাস জানিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলেন, উপজেলার ঘোষগাঁও গ্রামের মৃৎশিল্পী পুতুল পাল। তিনি আরও জানান, বর্তমানে মাটির তৈরী তৈজসপত্রের বাজার প্লাস্টিকের দখলে চলে গেছে। 

আমাদের বর্তমানে অসহায়’র মতো দিনযাপন করতে হচ্ছে। বর্তমানে মাটির তৈরী তৈজসপত্রের চাহিদা নেই বললেই চলে। তাই সীমিত পরিসরে সরা,পাতিল, জালের গুঁটি, মাটির গøাস, কলস, মাটির ব্যাংক বানাই। শীতকালে একটু কর্মব্যস্ততা থাকলেও বছরের বাকি দিন অলস সময়ই কাটাতে হয়। ঘোষগাঁও কুমারপাড়া ছাড়াও সরজমিনে গিয়ে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, উপজেলার ঢাকাদক্ষিণ ইউপির পূর্ব খর্দ্দাপাড়া (পাত্তন) এলাকায় প্রায় ৪০টি পাল পরিবারের বসবাস হলেও মাত্র ১টি পরিবার বর্তমানে মৃৎশিল্পে নিয়োজিত। 

লক্ষণাবন্দ ইউপির চক্রবর্ত্তীপাড়ায় ৮টি পাল পরিবারের বসবাস থাকলেও এ কাজে নিয়োজিত আছে মাত্র ২টি পরিবার। বাঘা ইউপির কান্দিগাঁও এলাকায় ৪/৫ পাল সম্প্রদায়ের মানুষ বসবাস করলেও কুমার পেশায় নিয়োজিত আছেন মাত্র ২টি পরিবার। মৃৎশিল্পের বিলুপ্তির পিছনে বর্তমান সময়ের বৈরি পরিস্থিতি ও আর্থিক সংকটের কথা বলেন তারা। তারা বলেন, প‚র্বের দিনে মৃৎশিল্পের প্রয়োজনীয় উপকরণ এঁটেল মাটি, রঙ, যন্ত্রপাতি ও জ্বালানি ছিল সহজলভ্য ছিল। 

কিন্তু বর্তমানে এসব প্রয়োজনীয় উপকরণের দ্রব্যমূল্যের কারণে তারা হিমশিম খাচ্ছেন তারা। প‚র্বে যেখানে বিনা ম‚ল্যে মাটি সংগ্রহ করা যেত, বর্তমানে এ মাটিও অগ্রিম টাকায় কিনতে হচ্ছে এবং ঋণ প্রদানে অনীহা ও প্রয়োজনীয় পৃষ্ঠপোষকতার অভাব আর প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ সাধিত না হওয়ায় তা আজ বিলুপ্ত হচ্ছে। 

গোলাপগঞ্জের এই বিলুপ্তপ্রায় মৃৎশিল্পকে টিকিয়ে রাখতে, কুমারদের পরিবারভিত্তিক ব্যাংক ঋণ ও আধুনিক প্রযুক্তির প্রয়োগ সম্পর্কে প্রশিক্ষণ ও কারিগরি উপকরণ সহায়তা করলে এখনও মৃৎশিল্প’র উন্নয়নের মাধ্যমে নিজস্ব চাহিদা পুরন করে বিদেশে রপ্তানী করা সম্ভব হবে বলে মনে করেন গোলাপগঞ্জের কুমারগোষ্ঠী। গোলাপগঞ্জের ঐতিহ্যের অন্যতম ধারক এই মৃৎশিল্পকে ঠিকিয়ে রাখতে সরকারি ও বেসরকারি সহযোগীতা প্রয়োজন বলে মনে করেন গোলাপগঞ্জের সচেতন মহল।