:: 28-9-2020  
menu
(পরীক্ষামূলক সম্প্রচার)

চিরদিন কাহারো সমান নাহি যায়

এবার নিউইয়র্কে তীব্র গরম পড়ছে। ফোবানা সম্মেলনে যোগ দিতে ৩ সেপ্টেম্বর মধ্যরাতে নামলাম জেএফকে বিমানবন্দরে। হোটেলে যেতে যেতে ৪ তারিখ শুরু। জেট লগে পড়লাম না। তাই রাতে শুয়েই ঘুম। ঘুম ভাঙে সকালবেলা। অফিসে ফোন করে খোঁজখবর নিই। গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো সেরে নিই। তারপর বের হই হাঁটতে। আমার হোটেলটি বিমানবন্দরের কাছে। ফোবানার সব অতিথি এখানে উঠেছেন। সকালে পরিচয় হয় অনেকের সঙ্গে। এর মাঝে রয়েছেন ফ্লোরিডার প্রাণখোলা মানুষ আতিক রহমান। সব সময় হাসি লেগেই আছে। গল্পগুজবে আসর মাতিয়ে রাখেন।

News image

এনটিভির হোসেন সাঈদ বললেন, এমন প্রাণবন্ত মানুষের সংখ্যা কম আছে। আমিও একমত। বিকালে ফোবানার অনুষ্ঠান। ব্রেকফাস্ট সেরে ইউটিউবে গান শুনলাম কিছুক্ষণ। নজরুলের একের পর এক বিখ্যাত গান বেজে চলছে আইপ্যাডে। 'এমনই বর্ষা ছিলো সেইদিন, শিয়রে প্রদীপ ছিলো মলিন, হাতে ছিলো অলস বীন...' পরের গান 'গভীর নিশিথে ঘুম ভেঙ্গে যায়, কে যেন আমায় ডাকে, সে কি তুমি'। 'দূর দ্বীপবাসিনী...', শেষ গানটি ছিল- 'চিরদিন কাহারো সমান নাহি যায়, আজকে রাজাধিরাজ, কাল সে ভিক্ষা চায়'। কবি নজরুলের তিন হাজারের বেশি গানের মধ্যে জনপ্রিয় ধারার শতাধিক অসাধারণ। বিদ্রোহ, সুখ-দুঃখ, বিরহ, আনন্দ-বেদনা, পূজা, প্রেম সব নিয়েই লিখেছেন। ধর্ম-বর্ণ বাদ যায়নি। তার অসাম্প্রদায়িক চিন্তার কোনো তুলনা ছিল না। জীবনবোধকে তিনি উপলব্ধি করেছেন বাস্তবতা নিয়ে। নিউইয়র্কে বসে নজরুলের গান শুনতে শুনতে নানামুখী চিন্তায় আচ্ছন্ন হই। এ গানটি আমার মনে গেঁথে যায়, চিরদিন কাহারো সমান নাহি যায়। বাস্তবতা তো তা-ই।

তিন দিনের ফোবানা সম্মেলনে ভালোই লেগেছে। আমেরিকা-কানাডার বাঙালিদের মিলনমেলা ছিল। পরিবার-পরিজন নিয়ে সবাই অংশ নিয়েছেন। নিজেদের বন্ধুত্বের হাত আরও শক্তিশালী করেছেন। সম্মেলনে দেখা হলো যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার অন্যতম উপদেষ্টা ড. নীনা আহমেদ, কংগ্রেসওমেন গ্রেস ম্যাং, নিউইয়র্ক সিটির পাবলিক অ্যাডভোকেট লেটিসিয়া জেমস, নিউইয়র্ক স্টেট সিনেটর লিরয় কমরি, জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি ড. এ কে এ মোমেন, কালি প্রদীপ চৌধুরীসহ অনেকের সঙ্গে। কংগ্রেসওমেন গ্রেস ম্যাং নিজ থেকে এসে কথা বললেন। গত বছর তার অফিসে গিয়েছিলাম। আর ড. নীনার সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলাম ফিলাডেলফিয়ায়। সম্মেলন সফল করেছেন ফোবানার নেতা বেদারুল ইসলাম বাবলা, আতিক রহমান, ড. নুরুন্নবী, ডিউক খান, আজাদুল হক, জাকারিয়া চৌধুরী, আবদুল কাদের মিয়া, এন আমিন প্রমুখ। ছিলেন এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংকের চেয়ারম্যান নিজাম চৌধুরী, মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কমান্ড কাউন্সিলের চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) হেলাল মোর্শেদ খান, ভোরের কাগজ সম্পাদক শ্যামল দত্ত। সম্মেলনের ভালো দিক ছিল টানা তিন দিন বিভিন্ন সেমিনার। শিল্প-সাহিত্য, মুক্তিযুদ্ধসহ বিভিন্ন বিষয়ে। আমরাও অংশ নিয়েছি কয়েকটিতে। খোলামেলা আলোচনায় প্রবাসীরা তুলে ধরলেন বাংলাদেশকে নিয়ে তাদের ভাবনার কথা।

সম্মেলনের পরদিন এক মধ্যাহ্নভোজে দেখা হয় ড. মোমেনের সঙ্গে। অনেক বিষয়ে কথা হয়। কথায় কথায় তিনি জানালেন, আমেরিকায় বাঙালিরা অনেক ভালো করছে। তাদের একজন ডা. কালি প্রদীপ চৌধুরী। আমি মন্ত্রমুগ্ধে শুনছি একজন বাঙালির যুক্তরাষ্ট্র জয়ের কাহিনী। কালি প্রদীপ চৌধুরীর পূর্বপুরুষরা ছিলেন সিলেটের জমিদার। সিলেট মহিলা কলেজ তাদের বাড়িতে করা। এখনো তাদের আরেকটি বাড়ি পড়ে আছে। এ মানুষটি যুক্তরাষ্ট্রের শুধু একজন বড় চিকিৎসক নন, বড় ব্যবসায়ীও বটে। যুক্তরাষ্ট্রে ২২টি হাসপাতালের মালিকানায় রয়েছেন তিনি। ফ্লোরিডায় লিজ নিয়েছেন ৯০ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের একটি সড়ক। এ সড়কের টোল তোলার দায়িত্বে তার কোম্পানি। এ ছাড়াও তার রয়েছে আরও অনেক ব্যবসা। ঠিকানা পত্রিকার লাভলু আনসার বললেন, কালি প্রদীপ কলকাতায় একটি বড় হাসপাতাল করেছেন। তিনি সেখানে আশাব্যঞ্জক সম্মান পাননি। তাই এখন নিউইয়র্কে বাংলাদেশি কমিউনিটির পাশে দাঁড়িয়েছেন। বড় কিছু করতে চান সিলেটে। একটি হাসপাতাল করার চিন্তা রয়েছে। কলকাতায় তার আত্মীয়-পরিজন অনেক থাকলেও বাংলাদেশকে নিয়েই তার চিন্তা। ড. মোমেন আমাকে বললেন, কালিবাবুর সঙ্গে তার এ নিয়ে কথা হয়েছে। তিনি আশা করছেন, খুব তাড়াতাড়ি সিলেটের হাসপাতালটির কাজ শুরু হবে। বাংলাদেশে প্রবাসীদের আরও বেশি করে বিনিয়োগ ও মানবতার সেবায় এগিয়ে আসার জন্য ড. মোমেন অনেক দিন থেকে কাজ করছেন। বাঙালি কমিউনিটিতে তার জনপ্রিয়তাও অনেক। প্রবাসীদের প্রতিটি পারিবারিক, সামাজিক অনুষ্ঠানে তিনি অংশ নেন। ড. মোমেনের মেয়াদ শেষ হয়ে আসছে। ভবিষ্যতে রাজনীতি করতে পারেন। ফিরে আসবেন দেশে। জানতে চাইলাম, রাজনীতি করবেন কি না? জবাবে বললেন, আমার সব কিছু হঠাৎ ঘটে। রাজনীতি নিয়ে কী হবে এখনো জানি না। আমিও অপেক্ষায় আছি।

রাজনীতি আসলেই এক জটিল অঙ্ক। কখন কী হয় কেউ জানে না। আর সৎ ও ভালো মানুষদের রাজনীতিতে আগমনও কম। এখন শুরু থেকেই তৈরি হয় চাওয়া-পাওয়া। ড. মোমেনের রাজনীতিতে আসার চিন্তা ইতিবাচক। ভালো মানুষরা যত বেশি রাজনীতিতে আসবেন তত ভালো। রাজনীতিকে মানবকল্যাণ হিসেবে নিতে হবে। সৎ, নিষ্ঠাবান মানুষের সংখ্যা রাজনীতিতে কমে যাচ্ছে। বঙ্গবন্ধুর কারাসঙ্গী ছিলেন রাজনীতিবিদ মরহুম মহিউদ্দিন আহমেদ (বাকশালের চেয়ারম্যান)। তিনি রিকশায় চড়ে ধানমন্ডি ৩৩ নম্বর সড়কের বাড়ি থেকে সংসদে যেতেন। '৯২ সালে একবার পুলিশ তার রিকশা আটকে দেয় সংসদ ভবনে প্রবেশের মুখে। তিনি পরিচয় দেন আমি এমপি। যেতে দাও বাবারা। পুলিশ বলল, স্যার দুঃখিত। সংসদ ভবনে রিকশা প্রবেশে অনুমতি নেই। শুধু গাড়ি প্রবেশের অনুমতি রয়েছে। আমাদের ক্ষমা করবেন স্যার। আসাদ গেটের কোনা থেকে বয়োবৃদ্ধ মানুষটি হেঁটে যান সংসদে। মন খারাপ করে পয়েন্ট অব অর্ডার তোলেন। স্পিকার শেখ রাজ্জাক আলী তাকে ফ্লোর দেন। মহিউদ্দিন আহমেদ বললেন, মাননীয় স্পিকার এই সংসদে শুধু গাড়ির প্রবেশের অধিকার আছে। সাধারণ মানুষের রিকশা প্রবেশ করতে দেওয়া হয় না, ঠিক আছে। কিন্তু একজন এমপি যার গাড়ি নেই তিনি সংসদে আসতে হলে কি হেঁটে আসবেন? তিনি তার রিকশা আটকে দেওয়ার কাহিনী শোনালেন সংসদকে। সব শুনলেন স্পিকার শেখ রাজ্জাক আলী। তারপর দুঃখ প্রকাশ করলেন। বললেন, আমাদের এই সংসদের সব সদস্য গাড়ি চড়ে আসেন না। রিকশায় চড়েও অনেক এমপি আসেন। তাদের অধিকার অবশ্যই রক্ষা করতে হবে। '৯১ সালের সংসদেও আমাদের রিকশায় চড়ে সংসদে যাওয়ার এমপি ছিলেন। এখন সবকিছু কল্পকাহিনী মনে হবে। আমাদের এখনকার এমপিরা এত গরিবির কথা চিন্তাও করতে পারেন না। পারবেন না।

এখনকার এমপিরা বেশির ভাগ ব্যবসায়ী। তারা বিনা ভোটে নির্বাচিত হন। যাদের ব্যবসা-বাণিজ্য নেই, তারা নিজেকে ব্যবসায়ী হিসেবে তৈরি করতে লড়ছেন। এলাকাকে ব্যবহার করেন ব্যবসার কাজে। নিজেরা ঠিকমতো এলাকায়ও যান না। কর্মীদের সঙ্গে সম্পর্ক রাখেন না। জনগণের প্রতি তাদের কোনো দরদ নেই। এমপি হয়ে অনেকে লিপ্ত দখলে, সন্ত্রাসে, চাঁদাবাজি আর গম কেলেঙ্কারিতে। কিছু এমপি এখন আর শুধু গমের কমিশনে বিশ্বাসী নন। তারা শতভাগ গম বিক্রি করে দেন। সেই অর্থ দলের ফান্ডে নয়, নিজের অ্যাকাউন্টে ভরেন। মাঝে মাঝে হতাশ হই। বিস্মিত হই। যা ঘটছে তার ৩০ ভাগ খবরও মিডিয়ায় আসে না। মাঠ পর্যায়ের সংবাদকর্মীরা সাহস পান না খবর পাঠাতে। ফোনে তারা বলেন, ভাই ভয়ে আছি। বিপদে আছি। আমরাও আমাদের প্রতিনিধিদের বিপদে রাখতে চাই না। আওয়ামী লীগের মতো ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানের কাছে আমরা ভালো কিছু চাই। আর ভালো কিছু করতে সতর্ক থাকতে হবে সরকারকেও। বিরোধী দল নেই বলে যা খুশি তা করা যায় না। করাও ঠিক নয়। বুঝতে হবে অহমিকা-দম্ভ মানব জীবনে সর্বনাশ ডেকে আনে। ক্ষমতাসীনদের ওপর আবারও অহমিকা ভর করেছে। কারণে-অকারণে এখন ইস্যু সৃষ্টি করা হচ্ছে। নিজেদের করা এ ইস্যুর মদদদাতা চাটুকার আমলা, পুলিশ এবং সরকারি দলের লোকজন। কেউ বোঝার চেষ্টা করছেন না কবি নজরুলের সেই কথা, চিরদিন কাহারো সমান নাহি যায়। চিরদিন কারও এক সমান যায় না। উত্থান-পতন আছে। ভুল একবার শুরু হলে চলতে থাকে। কারণ সবকিছু স্বাভাবিক কারোরই ভালো লাগে না।

কথায় আছে, সুখে থাকলে ভূতে কিলায়। ভ্যাট ঝামেলা এরই অংশ। অকারণে এ ইস্যু তৈরি আর কেউ নয়, সরকারই করল। শিক্ষার্থীদের জানিয়ে দিল কীভাবে দাবি আদায় করে নিতে হয়। এ প্রসঙ্গে একটা প্রবাদ মনে পড়ছে। এক লোকের জেঠা মারা গেছে। মৃত্যুর পর সবার কান্না থামলেও ভাতিজার কান্না থামছে না। সবাই অনুরোধ করল এবার তুই থাম। কান্নাজড়িত কণ্ঠে ভাতিজা বলল, জেঠার জন্য এখন কাঁদছি না। কাঁদছি নিজের বাপের জন্য। জম আমাদের বাড়ি চিনি গেছে। এরপর তো বাবার সিরিয়াল। এবার ছাত্র আন্দোলন আমার সেই কথাই মনে করিয়ে দেয়। প্রথম দিনেই এই ভ্যাট ভুলের সংশোধন করা যেত। আর ভ্যাট আরোপের আগে এ নিয়ে গবেষণার দরকার ছিল। এর প্রভাব কী পড়বে, শিক্ষার্থীদের প্রতিক্রিয়া কী দাঁড়বে তা আগেই ভেবে দেখা দরকার ছিল। ভাবিয়া করিও কাজ করিয়া ভাবিও না। সরকার ভেবে কাজ করে বলে মনে হয় না। কাজ করার পর ভাবে। সমস্যা এখানেই। ৫ জানুয়ারির আগের সরকার আর বর্তমান সরকারের মধ্যে একটু পার্থক্য আছে। সরকারকে এ বিষয়টি মাথায় রেখে কাজ করতে হবে। জনগণকে বোকা মনে করার কারণ নেই। পচা শামুকে পা কাটে। তাই নিজ থেকে কারণে-অকারণে ইস্যু তৈরির দরকার নেই। এবার প্রথমে সরকারি দলের নেতা-কর্মীরা নিজেরা খুনোখুনিতে লিপ্ত হলো। এ ছাড়া চাঁদাবাজি আর টেন্ডার নিয়ে ঝগড়া-বিবাদ লেগেই আছে। সাধারণ মানুষ সব দেখছে, হতাশ হচ্ছে। ক্ষুব্ধ হচ্ছে। এর মধ্যে দাম বাড়াল গ্যাস, বিদ্যুতের। তারপর পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের শিক্ষকদের মর্যাদা ও বেতন নিয়ে শুরু হলো ঝামেলা। পদাবনতি করার কী দরকার ছিল? এই শিক্ষকদের নিয়ে ঝামেলার সিদ্ধান্ত ভালো ফল আনবে না। বিশ্ববিদ্যালয় বাদই দিলাম, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা প্রিসাইডিং অফিসারের দায়িত্ব পালন করেন। এই জীবনে আর নির্বাচন করতে হবে না- এমন ভাবনা পরিত্যাগ করা ভালো। যদি নির্বাচন করতেই হয় তাহলে কী দাঁড়াবে? সবাইকে খেপিয়ে রাষ্ট্র চালানো কি এত সহজ! কিছুই বলার নেই আমার।

পাদটীকা : হুমায়ূন আহমেদের বিখ্যাত চরিত্রের নাম হিমু। এ হিমুর খালার নাম মাজেদা। খালাতো ভাই বাদল। খালা ও খালাতো ভাই হিমুকে অন্ধের মতো পছন্দ করেন। কিন্তু খালু করেন না। খালুজান মেজাজি মানুষ। তিনি নিয়মিত হুইস্কি খান। এ হুইস্কি খোলার জন্য তার একটা অসিলা লাগে। বাড়িতে কোনো উৎসব হলেই খালুজান ব্ল্যাক লেবেলের বোতল খোলেন। কোনো শোকের খবর, দুঃখের খবর শুনলেও খালুজানের মন খারাপ হয়ে যায়। তখনই তিনি বোতল নিয়ে বসে পড়েন। আসলে কোনো অকাজের জন্য অসিলা দরকার। এখানে যুক্তি মার খায় আবেগের কাছে। আমার এক বন্ধু আছে তার কাজই হলো আড্ডার জন্য অসিলা বের করা। মন খারাপ করে সে বসে থাকবে না। বের করবে নতুন বন্ধু। জমিয়ে আড্ডা দেবে, বোতল খুলবে। বললাম মন খারাপ হলে বোতল খুলতে হবে কেন? বন্ধু বলল, অসিলা দরকার।