:: 25-11-2020  
menu
(পরীক্ষামূলক সম্প্রচার)

জৈন্তপুরের লাল শাপলার বিলে পর্যটকদের ভিড়

নিজস্ব সংবাদদাতা, জৈন্তাপুর : সিলেটের উত্তর-পূর্বে অবস্থিত পান-পানি-নারী খ্যাত জৈন্তাপুর উপজেলা। এ উপজেলার লাল শাপলার বিল নামে পরিচিত ডিবির হাওর। ৪টি বিলে প্রায় ৯ শ একর ভ’মিতে প্রাকৃতিক ভাবে লাল শাপলার জন্ম। বিল গুলো হল ডিবি, ইয়াম, হরফকাট ও কেন্দ্রীবিল। শরতের অসংখ্য লাল শাপলা প্রাকৃতিক সম্পদে পরিণত হয়েছে এ অঞ্চলের মানুষের জন্য। লাল শাপলা বিলে গেলে চোখে পড়বে লাল-সবুজের হাতছানি। লাল-সবুজের সমারোহ দেখে রীতিমতো অবাক হতে হবে আপনাকে।প্রকৃতির যেন নিজ হাতে সাজিয়ে তুলে লাল শাপলার বিল সমুহ। আগাছা আর লতাগুল্মে ভরা বিলের পানিতে ফুটে আছে হাজার হাজার লাল শাপলা। সূর্যে সোনালি আভা শাপলা পাতার ফাঁকে ফাঁকে পানিতে প্রতিফলিত হয়ে কয়েকগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে এই বিলের সৌন্দর্য। নৌকা কিংবা হাঁটুপানি মাড়িয়ে বিলের মধ্যে প্রবেশ করলে একপর্যায়ে মনে হবে শাপলার স্বর্গরাজ্যে বন্দী হয়ে গেছেন আপনি। মনে হবে মৃদু বাতাসের সাথে সাথে লাল শাপলা আপনাকে হাসিমুখে অভ্যর্থনা জানাচ্ছে।লাল শাপলার হাসি বিলজুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে পরশমাখা ভালোবাসায়।

News image

পৌরণিক ইতিহাস হতে জানা যায়- ব্রিটিশ শাসিত ভারত উপমহাদেশের শেষ স্বাধীন রাজ্য ছিল জৈন্তিয়া। শ্রীহট্ট তথা ভারত বর্ষের অধিকাংশ এলাকা যখন মোগল সা¤্রাজ্যভ’ক্ত ছিলো, তখনও জৈন্তিয়া তার পৃথক ঐতিহ্য রক্ষা করে আসছিল। প্রায় ৩৫ বছর স্বাধীন রাজ্য হিসাবে পরিচালিত হয়েছে। মহাভারত এবং রামায়নে জৈন্তিয়া রাজ্যের কথা বিশেষ ভাবে উল্লেখ রয়েছে। ১৭৯০ খ্রিষ্টাব্দ রাজা বিজয় সিংহের শাসনকালে জৈন্তিয়ায় খনিজ সম্পদে ভরপুর ছিল বর্তমানেও রয়েছে। রাজা বিজয় সিংহ ১৭৭৮ সালে সারিঘাট ঢুপি গ্রামে রামেশ্বর শিব মন্দির স্থাপন করেন। ১৮৩৫ সালের ১৬ মার্চ হ্যারি নামক ইংরেজ রাজেন্দ্র সিংহকে কৌশলে বন্ধি করে মূল্যবান সম্পদ লুঠ করে নেয়। আর ডিবির হাওড় রাজা বিজয় সিংহের স্মৃতি বিজড়িত সমাধী স্থলেই লাল শাপলার বিল গুলো অবস্থিত। বিলের পারে বিজয় সিংএর সমাধি পর্যটক দের এ জেন আরেক জানার কৌতূহল জাগিয়ে তুলে।

সূর্যদয়ের সাথে সাথে বেলা ১১ পর্যন্ত লাল শাপলার সৌন্দর্য্য দৃশ্যমান থাকে। বেলা বাড়ার সাথে সাথে শাপলা গুলো নিশ্চুপ নীরব হয়ে যায়। লাল শাপলার ফুটন্ত ফুল ডিবির হাওড় আশ-পাশের পরিবেশকে মনোমুগ্ধকর করে তুলে। অপরূপ সৌন্দর্য্য উপভোগ করতে ঘন কোয়াশা ও শীত উপেক্ষা করে দেশের প্রত্যান্ত অঞ্চল জেলা ও উপজেলা থেকে দল বেধে ছুটে আসে অগনিত পর্যটক, ঢল নামে লাল শাপলার বিলে। বিলের লাল শাপলার ফুটন্ত ফুল যেন ভ্রমণ পিপাসু পর্যটকদের হাতছানি দিয়ে ডাকে। রয়েছে নানা প্রজাতির অতিথি পাখির কিছির মিছির সুর যেন মনে হয় প্রকৃতি নিজে বাধ্য যন্ত্রের ধারা সুরের ঝর্ণা ধারা ছড়িয়ে দিচ্ছে।

ডিবির হাওড় এর বিল গুলো বিগত ২০১৪ সনে স্থানীয় জাতিয় ও ইলেক্ট্রনিক্স মিডিয়ার কল্যাণে বিল গুলো পর্যটকদের কাছে পরিচিতি লাভ করলে স¤প্রতি কিছু অসাধু ভ’মি খেকুুচক্র কুদৃষ্টি পড়ে লাল শাপলার বিল গুলোর জেগে উঠা জমির দিকে। চক্রটি বিভিন্ন ভাবে দখলের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। ৪টি বিলের মধ্যে হরফকাটা বিলটি সৌন্দর্য্য নষ্ট করে দিয়েছে। মহিষ নামিয়ে শাপলা ফুল ধ্বংস করে দেওয়া, শাপলার মূল উত্তোলন করে দেওয়ার ফলে বিলে শাপলা গাছ থাকলেও ফুল শূন্য হয়ে পড়েছে। ইজারানীতি অমান্য করে অসময়ে বিলের পানি শুকিয়ে শাপলার মূল ধ্বংস করার কারনে কেন্দ্রী বিলের সৌন্দর্যতা নষ্ট করে দিয়েছে।

অপরদিকে স্থানীয় সামাজিক সংঘটন ও প্রকৃতিপ্রেমীরা দাবী তুলেছেন বাংলাদেশের বৃহত্তম হাওড়ের মধ্যে অন্যতম ডিবির হাওড়, হরফ কাটা, ইয়াম বিল ও কেন্দ্রী বিল। বিলগুলোর ইজারা বাতিল করা এবং বিল সমুহের ভূমির শ্রেণি পরিবর্তন করে বন্ধোবস্তের অপচেষ্টা বন্ধ করা ও বাতিলের দাবী জানান।

বিলগুলো রক্ষার্থে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন বাপা'র উদ্যোগে কেন্দ্রীয় শহিদ মিনার সিলেটে মানববন্ধন পালন করে। এছাড়া লাল শাপলা বাঁচাও আন্দোলন কমিটি ও জৈন্তিয়া পর্যটন উন্নয়ন ও সংরক্ষণ কমিটি লাল শাপলা বিল গুলোর লীজ বাতিল এবং পর্যটন কেন্দ্র ঘোষনার দাবী জানিয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মৌরীন করিমের মাধ্যমে জেলা প্রশাসক বরাবরে পৃথক পৃথক স্মারকলিপি প্রদান করা হয়।

পর্যটকদের মতে সিলেটের দর্শনীয় স্থান সমূহের তালিকায় হরিপুর গ্যাসফিল্ডের ৭নং গ্যাস কুপ, জৈন্তাপুর সাইট্রাস গবেষণা কেন্দ্রে, রাতারগুল, বিছনাকান্দি, মায়াবন, পান্থুমাই, মায়াবতী ঝর্ণা, বল্লার ঘাটের জমিদার বাড়ী, লালাখাল, শ্রীপুর চা-বাগান, জাফলং চা বাগান, দর্শনীয় স্থান গুলোর মধ্যে ডিবির হাওড়ের লাল শাপলার ৪টি  ভি ও পর্যটকদের কাছে শীর্ষ স্থান দখল করে নিচ্ছে।